কিডনি রোগের লক্ষণ, কিডনি বিকল হওয়ার কারণ, ডায়ালাইসিস, কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট ও খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ

কিডনি (Kidney) আমাদের শরীরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ, যা রক্ত পরিশোধন, অতিরিক্ত পানি ও বর্জ্য অপসারণ, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ এবং শরীরের বিভিন্ন খনিজের ভারসাম্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, দীর্ঘদিন ব্যথার ওষুধ (Painkiller) সেবন এবং অন্যান্য কারণে কিডনির কার্যক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে যেতে পারে।
সমস্যা হলো, কিডনি রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে অনেকেরই কোনো লক্ষণ থাকে না। তাই অনেক রোগীর ক্ষেত্রে রোগ ধরা পড়ে যখন কিডনির উল্লেখযোগ্য ক্ষতি ইতোমধ্যে হয়ে গেছে।
এই ভিডিওতে নেফ্রোলজি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডাঃ মোঃ শরিফুল হক কিডনি রোগের প্রাথমিক লক্ষণ, কিডনি বিকল হওয়ার কারণ, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা, চিকিৎসা, খাদ্যাভ্যাস এবং কিডনি সুস্থ রাখার উপায় সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।
কিডনি শুধু প্রস্রাব তৈরি করে না, বরং শরীরের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ নিয়ন্ত্রণ করে।
কিডনি রক্ত থেকে বর্জ্য পদার্থ ও অতিরিক্ত তরল ছেঁকে প্রস্রাবের মাধ্যমে শরীর থেকে বের করে দেয়।
কিডনি শরীরে পানি, সোডিয়াম, পটাসিয়াম এবং অন্যান্য ইলেক্ট্রোলাইটের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।
কিডনি কিছু হরমোনের মাধ্যমে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং লোহিত রক্তকণিকা তৈরিতেও সহায়তা করে।
প্রাথমিক পর্যায়ে লক্ষণ নাও থাকতে পারে। তবে রোগ বাড়লে নিম্নোক্ত উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
বিশেষ করে:
পা
গোড়ালি
মুখ
চোখের পাতা
ফুলে যেতে পারে।
প্রস্রাব কম বা বেশি হওয়া
রাতে বারবার প্রস্রাব হওয়া
প্রস্রাবে ফেনা দেখা যাওয়া
প্রস্রাবে রক্ত আসা
কিডনির কার্যক্ষমতা কমে গেলে দুর্বলতা ও সহজে ক্লান্তি অনুভূত হতে পারে।
ক্ষুধা কমে যাওয়া, বমি বমি ভাব বা বমি হতে পারে।
শরীরে অতিরিক্ত পানি জমে গেলে শ্বাস নিতে কষ্ট হতে পারে।
এছাড়াও থাকতে পারে:
ত্বকে চুলকানি
মনোযোগ কমে যাওয়া
পেশিতে খিঁচুনি
ডায়াবেটিস দীর্ঘমেয়াদে কিডনি বিকলের অন্যতম প্রধান কারণ।
অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ কিডনির সূক্ষ্ম রক্তনালির ক্ষতি করতে পারে।
দীর্ঘদিন চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কিছু ব্যথানাশক ওষুধ সেবন কিডনির ক্ষতির ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
বারবার কিডনির সংক্রমণ বা কিছু অন্যান্য কিডনি রোগ দীর্ঘমেয়াদে কিডনির কার্যক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে।
AKI হলো হঠাৎ অল্প সময়ের মধ্যে কিডনির কার্যক্ষমতা কমে যাওয়া। দ্রুত চিকিৎসা করলে অনেক ক্ষেত্রে এটি আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে ভালো হতে পারে।
AKD হলো AKI-এর পরবর্তী পর্যায়, যেখানে কিডনির সমস্যা কয়েক সপ্তাহ থেকে তিন মাস পর্যন্ত স্থায়ী থাকতে পারে।
CKD হলো দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগ, যেখানে তিন মাস বা তার বেশি সময় ধরে কিডনির কার্যক্ষমতা কম থাকে।
AKI, AKD এবং CKD—তিনটিই গুরুত্বপূর্ণ। তবে CKD দীর্ঘদিন চলতে থাকলে কিডনি বিকল হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। অন্যদিকে AKI দ্রুত চিকিৎসা না করলে জীবনহানিকর জটিলতা তৈরি করতে পারে।
কিডনির পাথরের ক্ষেত্রে দেখা যেতে পারে:
কোমর বা পাশের তীব্র ব্যথা
প্রস্রাবে রক্ত
বমি বমি ভাব
প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া
অন্যদিকে সাধারণ কিডনি সিস্টের অনেক ক্ষেত্রেই কোনো উপসর্গ নাও থাকতে পারে এবং তা অন্য কারণে পরীক্ষা করতে গিয়ে ধরা পড়ে।
চিকিৎসা নির্ভর করে পাথর বা সিস্টের আকার, অবস্থান, উপসর্গ এবং জটিলতার ওপর।
রক্তে ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা কিডনির কার্যক্ষমতা মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
Estimated Glomerular Filtration Rate (eGFR) কিডনি কতটা কার্যকরভাবে রক্ত পরিশোধন করছে তা বোঝাতে সাহায্য করে।
কিডনি রোগে রক্তে পটাসিয়ামের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে, যা গুরুতর জটিলতার কারণ হতে পারে।
প্রস্রাবে প্রোটিন, রক্ত, সংক্রমণ বা অন্যান্য অস্বাভাবিকতা মূল্যায়নে এই পরীক্ষা করা হয়।
কিডনির আকার, গঠন, পাথর, সিস্ট বা বাধা আছে কি না তা মূল্যায়নে আল্ট্রাসনোগ্রাম করা হয়।
কিডনি রোগের কারণ ও পর্যায় অনুযায়ী চিকিৎসক ওষুধ দিতে পারেন।
কিডনির কার্যক্ষমতা গুরুতরভাবে কমে গেলে ডায়ালাইসিসের প্রয়োজন হতে পারে।
নির্বাচিত রোগীর ক্ষেত্রে কিডনি প্রতিস্থাপন (Kidney Transplant) দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার একটি কার্যকর বিকল্প হতে পারে।
খাদ্যতালিকা রোগের ধরন ও পর্যায় অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে। তাই ব্যক্তিগত খাদ্য পরিকল্পনার জন্য চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
অতিরিক্ত লবণ এড়িয়ে চলা উচিত, বিশেষ করে উচ্চ রক্তচাপ বা শরীর ফুলে যাওয়ার ক্ষেত্রে।
কতটুকু পানি পান করা উচিত, তা রোগীর কিডনির কার্যক্ষমতা ও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্ধারণ করা উচিত।
প্রোটিনের পরিমাণ রোগের পর্যায় অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন হতে পারে।
কিছু রোগীর ক্ষেত্রে কলা, কমলা, নারকেলের পানি, আলুসহ উচ্চ পটাসিয়ামযুক্ত খাবার সীমিত রাখতে হতে পারে।
অগ্রসর কিডনি রোগে কিছু ফসফরাসসমৃদ্ধ খাবার সীমিত করার পরামর্শ দেওয়া হতে পারে।
রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখা কিডনি সুরক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রক্তচাপ নিয়মিত পরীক্ষা করুন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
ধূমপান কিডনি ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখতে এবং ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিয়মিত ব্যায়াম করুন।
এছাড়াও:
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘদিন ব্যথার ওষুধ খাবেন না।
নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করুন, বিশেষ করে ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ থাকলে।
নিম্নোক্ত পরিস্থিতিতে নেফ্রোলজি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত:
রক্তে ক্রিয়েটিনিন বেড়ে গেলে
eGFR কমে গেলে
প্রস্রাবে প্রোটিন বা রক্ত পাওয়া গেলে
শরীর ফুলে গেলে
দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ থাকলে
কিডনি রোগের পারিবারিক ইতিহাস থাকলে
বারবার কিডনিতে পাথর বা সংক্রমণ হলে
সব সময় নয়। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো উপসর্গ থাকে না।
এটি রোগের ধরন ও কারণের ওপর নির্ভর করে। কিছু তীব্র কিডনি সমস্যা সম্পূর্ণ ভালো হতে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগের ক্ষেত্রে লক্ষ্য থাকে রোগের অগ্রগতি ধীর করা এবং জটিলতা কমানো।
হ্যাঁ। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘদিন কিছু ব্যথানাশক ওষুধ সেবন কিডনির ক্ষতির ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
না। সব রোগীর ডায়ালাইসিস প্রয়োজন হয় না। এটি কিডনির কার্যক্ষমতার ওপর নির্ভর করে।
সব সময় নয়। রোগীর অবস্থা অনুযায়ী চিকিৎসক কতটুকু পানি পান করা উচিত তা নির্ধারণ করেন।
কিডনি রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক সময় কোনো লক্ষণ থাকে না। তাই ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা কিডনি রোগের ঝুঁকি থাকলে নিয়মিত রক্ত ও প্রস্রাব পরীক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো রোগ নির্ণয়, সঠিক চিকিৎসা, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমে কিডনি বিকল হওয়ার ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
Content Source: Doctors24 Official YouTube Channel
Medical Expert Featured: ডাঃ মোঃ শরিফুল হক, এমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য), এমডি (নেফ্রোলজি), কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞ, সহযোগী অধ্যাপক, নেফ্রোলজি বিভাগ, শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ, গাজীপুর।
Content Prepared & Published By: Doctors24 Editorial Team
Last Updated: 25 June 2026 • Read Editorial Policy →
Connect with experienced nephrologist near you for consultation and treatment.