কিডনির সমস্যা: লক্ষণ, কারণ, কী পরীক্ষা করবেন, চিকিৎসা ও কোন ডাক্তার দেখাবেন

Doctors24 Editorial TeamAugust 10, 2026
কিডনির সমস্যা: লক্ষণ, কারণ, কী পরীক্ষা করবেন, চিকিৎসা ও কোন ডাক্তার দেখাবেন
Key Overview

"কিডনি (Kidney) শরীরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ, যা রক্ত থেকে বর্জ্য পদার্থ ও অতিরিক্ত পানি ছেঁকে প্রস্রাবের মাধ্যমে বের করে দেয়। এছাড়া কিডনি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ,..."

কিডনি (Kidney) শরীরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ, যা রক্ত থেকে বর্জ্য পদার্থ ও অতিরিক্ত পানি ছেঁকে প্রস্রাবের মাধ্যমে বের করে দেয়। এছাড়া কিডনি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, লোহিত রক্তকণিকা তৈরিতে সহায়তা এবং শরীরের পানি ও লবণের ভারসাম্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

প্রাথমিক পর্যায়ে কিডনির অনেক রোগে তেমন কোনো লক্ষণ থাকে না। তাই অনেকেই রোগটি বুঝতে পারেন না। সময়মতো শনাক্ত না হলে ক্রনিক কিডনি ডিজিজ (CKD), কিডনি বিকল (Kidney Failure) বা ডায়ালাইসিসের প্রয়োজন হতে পারে।

এই নিবন্ধে জানুন কিডনির সমস্যার লক্ষণ, কারণ, কী কী পরীক্ষা করা হয়, চিকিৎসার পদ্ধতি এবং কখন নেফ্রোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া উচিত।


কিডনির সমস্যা কী?

কিডনির সমস্যা বলতে এমন সব রোগকে বোঝায়, যেখানে কিডনি স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারে না। এটি হঠাৎ (Acute Kidney Injury) বা ধীরে ধীরে (Chronic Kidney Disease) হতে পারে।


কিডনির সমস্যার প্রধান কারণ

ডায়াবেটিস

বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগের অন্যতম প্রধান কারণ।

উচ্চ রক্তচাপ

অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ কিডনির ক্ষতি করতে পারে।

কিডনিতে সংক্রমণ (Kidney Infection)

ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে কিডনির প্রদাহ হতে পারে।

কিডনিতে পাথর (Kidney Stone)

প্রস্রাবের পথ বন্ধ হয়ে কিডনির ক্ষতি হতে পারে।

গ্লোমেরুলোনেফ্রাইটিস

কিডনির ফিল্টারিং ইউনিটে প্রদাহ সৃষ্টি হয়।

বংশগত কিডনি রোগ

যেমন Polycystic Kidney Disease (PKD)

দীর্ঘদিন ব্যথানাশক ওষুধ সেবন

NSAIDs-এর মতো কিছু ওষুধ দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে কিডনির ক্ষতি হতে পারে।

অটোইমিউন রোগ

যেমন লুপাস (SLE) কিডনিকে আক্রান্ত করতে পারে।

প্রস্রাবের পথের বাধা

প্রোস্টেট বড় হওয়া, টিউমার বা জন্মগত সমস্যার কারণে হতে পারে।


কিডনির সমস্যার লক্ষণ

পা, গোড়ালি বা মুখ ফুলে যাওয়া

শরীরে অতিরিক্ত পানি জমে যাওয়ার কারণে।

প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া

প্রস্রাবে রক্ত

প্রস্রাবে ফেনা হওয়া

প্রস্রাবে অতিরিক্ত প্রোটিন থাকার লক্ষণ হতে পারে।

ঘন ঘন প্রস্রাব

বিশেষ করে রাতে।

দুর্বলতা ও ক্লান্তি

ক্ষুধামন্দা

বমি বমি ভাব বা বমি

ত্বকে চুলকানি

শ্বাসকষ্ট

শরীরে অতিরিক্ত তরল জমে গেলে হতে পারে।

উচ্চ রক্তচাপ

নিয়ন্ত্রণে না আসা উচ্চ রক্তচাপ কিডনির রোগের লক্ষণ হতে পারে।


কারা কিডনির রোগের ঝুঁকিতে?

ডায়াবেটিস রোগী

উচ্চ রক্তচাপের রোগী

স্থূলতা

ধূমপায়ী

পরিবারে কিডনি রোগের ইতিহাস

৬০ বছরের বেশি বয়স

দীর্ঘদিন ব্যথানাশক ওষুধ সেবনকারী


কিডনির সমস্যা কীভাবে নির্ণয় করা হয়?

রোগের ইতিহাস

উপসর্গ, ওষুধ সেবনের ইতিহাস এবং অন্যান্য রোগ সম্পর্কে জানা হয়।

শারীরিক পরীক্ষা

রক্তচাপ, শরীর ফুলে যাওয়া এবং অন্যান্য লক্ষণ মূল্যায়ন করা হয়।


কিডনির সমস্যা নির্ণয়ে কী কী পরীক্ষা করা হয়?

Serum Creatinine

কিডনির কার্যকারিতা মূল্যায়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

eGFR (Estimated Glomerular Filtration Rate)

কিডনি কতটা কার্যকরভাবে রক্ত ছাঁকছে তা নির্ণয় করা হয়।

Urine Routine Examination (R/E)

প্রস্রাবে প্রোটিন, রক্ত বা সংক্রমণ আছে কিনা দেখা হয়।

Urine Albumin-to-Creatinine Ratio (ACR)

কিডনির প্রাথমিক ক্ষতি শনাক্ত করতে গুরুত্বপূর্ণ।

Blood Urea (BUN)

কিডনির কার্যকারিতা মূল্যায়নে সহায়ক।

Electrolytes (Sodium, Potassium)

শরীরের লবণের ভারসাম্য মূল্যায়নে।

CBC (Complete Blood Count)

রক্তস্বল্পতা বা সংক্রমণ মূল্যায়নে।

Blood Sugar (FBS/HbA1c)

ডায়াবেটিস আছে কিনা বা নিয়ন্ত্রণে আছে কিনা দেখতে।

Lipid Profile

হৃদরোগের ঝুঁকি মূল্যায়নে।

Kidney Ultrasound (KUB Ultrasound)

কিডনির আকার, পাথর, সিস্ট বা বাধা আছে কিনা দেখতে।

CT Scan KUB

কিডনিতে পাথর বা অন্যান্য জটিল সমস্যার ক্ষেত্রে।

Kidney Biopsy

নির্বাচিত ক্ষেত্রে কিডনির রোগের সুনির্দিষ্ট কারণ নির্ণয়ের জন্য।


কিডনির সমস্যার চিকিৎসার পদ্ধতি

মূল কারণের চিকিৎসা

ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

ওষুধ

রোগের ধরন অনুযায়ী বিভিন্ন ওষুধ ব্যবহার করা হয়।

খাদ্য নিয়ন্ত্রণ

লবণ, প্রোটিন, পটাশিয়াম বা ফসফরাস সীমিত করার পরামর্শ দেওয়া হতে পারে।

পর্যাপ্ত পানি পান

সব রোগীর জন্য একই পরিমাণ পানি উপযুক্ত নয়। কিডনির রোগের ধরন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসরণ করুন।

ডায়ালাইসিস

কিডনি গুরুতরভাবে অকার্যকর হলে প্রয়োজন হতে পারে।

কিডনি প্রতিস্থাপন (Kidney Transplant)

নির্বাচিত রোগীদের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হতে পারে।


কিডনি ভালো রাখতে কী করবেন?

রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখুন

পর্যাপ্ত পানি পান করুন

অতিরিক্ত লবণ কম খান

ধূমপান ত্যাগ করুন

চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ব্যথানাশক ওষুধ দীর্ঘদিন খাবেন না

নিয়মিত ব্যায়াম করুন

বছরে অন্তত একবার কিডনি পরীক্ষা করুন (ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে)


কখন জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে যাবেন?

প্রস্রাব একেবারে বন্ধ হয়ে গেলে

প্রস্রাবে প্রচুর রক্ত গেলে

তীব্র কোমর বা পাশের ব্যথা

শ্বাসকষ্ট

দ্রুত শরীর ফুলে যাওয়া

অচেতনতা বা বিভ্রান্তি

উচ্চ পটাশিয়ামের লক্ষণ (অনিয়মিত হৃদস্পন্দন)


কিডনির সমস্যা হলে কোন ডাক্তার দেখাবেন?

নেফ্রোলজিস্ট (কিডনি বিশেষজ্ঞ)

ক্রনিক কিডনি রোগ, কিডনি বিকল, প্রোটিন ইউরিয়া এবং ডায়ালাইসিস ব্যবস্থাপনায় সবচেয়ে উপযুক্ত বিশেষজ্ঞ।

মেডিসিন বিশেষজ্ঞ

প্রাথমিক মূল্যায়ন এবং সাধারণ কিডনি সমস্যার চিকিৎসায়।

ইউরোলজিস্ট

কিডনিতে পাথর, প্রস্রাবের পথের বাধা বা অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হলে।

এন্ডোক্রিনোলজিস্ট

ডায়াবেটিসজনিত কিডনি রোগে।


বাংলাদেশে সঠিক কিডনি বিশেষজ্ঞ কীভাবে নির্বাচন করবেন?

BMDC নিবন্ধন

চিকিৎসকের বৈধ BMDC নিবন্ধন নিশ্চিত করুন।

MD (Nephrology) / FCPS (Medicine) / MD (Medicine)

রোগের ধরন অনুযায়ী উপযুক্ত বিশেষজ্ঞ নির্বাচন করুন।

অভিজ্ঞতা

ক্রনিক কিডনি রোগ, ডায়ালাইসিস এবং কিডনি প্রতিস্থাপন-পরবর্তী রোগী ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞ চিকিৎসককে অগ্রাধিকার দিন।

হাসপাতালের সুবিধা

ডায়ালাইসিস, Kidney Biopsy, Kidney Ultrasound এবং প্রয়োজনীয় ল্যাব সুবিধাসম্পন্ন হাসপাতাল নির্বাচন করুন।

রোগীর রিভিউ

রোগীর মতামত দেখে ধারণা নিতে পারেন, তবে এটিই একমাত্র সিদ্ধান্তের ভিত্তি হওয়া উচিত নয়।


কিডনির সমস্যা সম্পর্কে সাধারণ প্রশ্ন (FAQ)

কিডনির রোগের প্রথম লক্ষণ কী?

প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক সময় কোনো লক্ষণ থাকে না। পরে পা ফুলে যাওয়া, প্রস্রাবে ফেনা, প্রস্রাবে রক্ত, দুর্বলতা এবং উচ্চ রক্তচাপ দেখা দিতে পারে।

Serum Creatinine বেশি হলে কি কিডনি নষ্ট হয়ে গেছে?

সব সময় নয়। তবে এটি কিডনির কার্যকারিতা কমে যাওয়ার ইঙ্গিত হতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী eGFR ও অন্যান্য পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

কিডনি ভালো রাখতে দিনে কতটুকু পানি পান করা উচিত?

এটি ব্যক্তিভেদে ভিন্ন। সুস্থ মানুষের জন্য পর্যাপ্ত পানি পান উপকারী হলেও কিডনি রোগ, হৃদরোগ বা লিভারের রোগ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পানি গ্রহণ করা উচিত।

কিডনির রোগ কি পুরোপুরি ভালো হয়?

রোগের ধরন অনুযায়ী ভিন্ন হয়। সংক্রমণ বা কিছু তীব্র সমস্যা সম্পূর্ণ ভালো হতে পারে। তবে ক্রনিক কিডনি ডিজিজ (CKD) সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি রোগ, যা নিয়মিত চিকিৎসার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।

ডায়াবেটিস রোগীদের কতদিন পরপর কিডনি পরীক্ষা করা উচিত?

সাধারণভাবে বছরে অন্তত একবার Serum Creatinine, eGFR এবং Urine Albumin পরীক্ষা করার পরামর্শ দেওয়া হয়। প্রয়োজনে চিকিৎসক আরও ঘন ঘন পরীক্ষা করতে বলতে পারেন।

কিডনিতে পাথর হলে কি সবসময় অপারেশন লাগে?

না। ছোট পাথর অনেক সময় ওষুধ ও পর্যাপ্ত পানি পান করলে নিজে থেকেই বেরিয়ে যেতে পারে। বড় পাথর বা জটিল ক্ষেত্রে ইউরোলজিস্ট অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দিতে পারেন।


Doctors24-এ কিডনি বিশেষজ্ঞ ডাক্তার খুঁজুন

Doctors24-এ বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার BMDC নিবন্ধিত নেফ্রোলজিস্ট (কিডনি বিশেষজ্ঞ), মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, ইউরোলজিস্ট এবং এন্ডোক্রিনোলজিস্ট-এর প্রোফাইল, যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, হাসপাতাল, চেম্বারের সময়সূচি এবং রোগীর রিভিউ এক জায়গায় দেখতে পারবেন। প্রস্রাবে রক্ত, পা ফুলে যাওয়া, প্রস্রাবে ফেনা, উচ্চ রক্তচাপ বা কিডনির সমস্যার লক্ষণ দেখা দিলে সময়মতো উপযুক্ত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে সঠিক চিকিৎসা শুরু করুন।

Content prepared by: Doctors24 Editorial Team

Medical information is verified using registered doctor data and trusted healthcare sources

Information sources: Public records, hospital data, and provided credentials

Published At: August 10, 2026

Last updated: August 10, 2026 Read Editorial Policy →

Related Nephrologist Articles

View all →

Related Nephrologist Videos

View all →