/
পিত্তথলিতে পাথর ধরা পড়লেই কি অপারেশন করতে হয়? জানুন পিত্তথলির পাথরের লক্ষণ, রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা ও কখন অপারেশন প্রয়োজন।

পিত্তথলিতে পাথর (Gallstones) ধরা পড়লেই যে অপারেশন করতে হবে, এমন নয়। অনেকের পিত্তথলিতে পাথর থাকলেও কোনো উপসর্গ দেখা দেয় না এবং চিকিৎসকের পরামর্শে পর্যবেক্ষণ করা যায়। তবে পাথরের কারণে বারবার পেটব্যথা, পিত্তথলিতে প্রদাহ, পিত্তনালিতে বাধা বা অন্য জটিলতা হলে অপারেশনের প্রয়োজন হতে পারে।
পিত্তথলির পাথরের চিকিৎসা নির্ভর করে পাথরের অবস্থান, উপসর্গ, পরীক্ষার ফলাফল এবং রোগীর সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপর। তাই আলট্রাসনোগ্রাফিতে পাথর ধরা পড়লে রিপোর্টসহ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
পিত্তথলি (Gallbladder) হলো যকৃতের নিচে অবস্থিত ছোট একটি থলির মতো অঙ্গ। এটি যকৃতে তৈরি হওয়া পিত্তরস (Bile) জমা রাখে এবং খাবার হজমে, বিশেষ করে চর্বি হজমে, সহায়তা করে।
পিত্তরসের কিছু উপাদান জমাট বেঁধে শক্ত দানার মতো পদার্থ তৈরি করলে তাকে পিত্তথলির পাথর বা Gallstones বলা হয়। পাথর একটি বা একাধিক হতে পারে এবং আকারেও ছোট-বড় হতে পারে।
প্রধানত দুই ধরনের পাথর দেখা যায়:
কোলেস্টেরল পাথর: পিত্তরসে কোলেস্টেরলের ভারসাম্য নষ্ট হলে এ ধরনের পাথর তৈরি হতে পারে।
পিগমেন্ট পাথর: পিত্তরসে বিলিরুবিনের পরিমাণ ও সংশ্লিষ্ট উপাদানের পরিবর্তনের সঙ্গে এ ধরনের পাথর তৈরি হতে পারে।
পিত্তথলিতে পাথর থাকলেই ব্যথা হবে, এমন নয়। পাথর পিত্তথলির মুখ বা পিত্তনালিতে বাধা সৃষ্টি করলে উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
পিত্তরসে কোলেস্টেরল, বিলিরুবিন এবং অন্যান্য উপাদান নির্দিষ্ট ভারসাম্যে থাকে। এই ভারসাম্য নষ্ট হলে বা পিত্তথলি ঠিকমতো খালি না হলে পিত্তরসের কিছু উপাদান জমাট বেঁধে ক্রমে পাথর তৈরি করতে পারে।
পাথর তৈরি হওয়ার পর সেটি পিত্তথলির ভেতরে থাকতে পারে। আবার কোনো পাথর পিত্তনালিতে চলে গিয়ে পিত্তরসের স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এর ফলে পেটব্যথা, জন্ডিস, সংক্রমণ বা অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহের মতো জটিলতা হতে পারে।
পিত্তথলিতে পাথর হওয়ার ঝুঁকি কয়েকটি কারণে বাড়তে পারে:
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে।
অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা।
দ্রুত ওজন কমানো বা দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা।
গর্ভাবস্থা এবং শরীরে হরমোনের কিছু পরিবর্তন।
ডায়াবেটিস ও কিছু বিপাকীয় সমস্যা।
পরিবারে পিত্তথলির পাথরের ইতিহাস থাকা।
যকৃতের কিছু রোগ বা রক্তের নির্দিষ্ট রোগ।
দীর্ঘদিনের অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস এবং কিছু ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ক্যালরিযুক্ত খাবার গ্রহণ।
তবে এসব ঝুঁকির কোনোটি থাকলেই পাথর হবে, এমন নয়। আবার কোনো স্পষ্ট ঝুঁকির কারণ না থাকলেও পিত্তথলিতে পাথর হতে পারে।
পিত্তথলির পাথরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, অনেকের কোনো লক্ষণ থাকে না। পাথর পিত্তথলির মুখ বা পিত্তনালিতে বাধা সৃষ্টি করলে সাধারণত ব্যথা ও অন্যান্য উপসর্গ দেখা দেয়।
পিত্তথলির পাথরের একটি সাধারণ লক্ষণ হলো পেটের ওপরের ডান পাশে ব্যথা। কখনো পেটের ওপরের মাঝামাঝি অংশেও ব্যথা হতে পারে।
ব্যথা হঠাৎ শুরু হয়ে তীব্র হতে পারে এবং কিছুক্ষণ থেকে কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। পাথরের কারণে পিত্তথলির মুখ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেলে এমন ব্যথা দেখা দিতে পারে।
বারবার একই ধরনের ব্যথা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। শুধু ব্যথার অবস্থান দেখে নিশ্চিতভাবে পিত্তথলির পাথর নির্ণয় করা যায় না।
কিছু মানুষের বিশেষ করে চর্বিযুক্ত বা ভারী খাবার খাওয়ার পর পেটের ওপরের অংশে ব্যথা বা অস্বস্তি হতে পারে। তবে সব রোগীর ক্ষেত্রে খাবারের সঙ্গে ব্যথার সম্পর্ক থাকে না।
বদহজম, গ্যাস বা পেট ফাঁপা পিত্তথলির পাথরের নির্দিষ্ট লক্ষণ নয়। এসব সমস্যা অন্য কারণেও হতে পারে। তাই শুধু খাবারের পর অস্বস্তি হলেই পিত্তথলিতে পাথর হয়েছে বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়।
পিত্তথলির পাথরের কারণে ব্যথা হলে বমি বমি ভাব বা বমি হতে পারে। তীব্র ব্যথার সঙ্গে বারবার বমি হলে পিত্তথলির প্রদাহ, পিত্তনালিতে বাধা বা অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহের মতো জটিলতা আছে কি না, তা পরীক্ষা করা জরুরি।
পিত্তথলির পাথরের ব্যথা কখনো পিঠের দিকে, দুই কাঁধের মাঝামাঝি অংশে বা ডান কাঁধে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এই ব্যথা পেটের ওপরের অংশে অস্বস্তির সঙ্গে থাকতে পারে।
তবে পিঠ বা কাঁধে ব্যথার আরও অনেক কারণ রয়েছে। ব্যথার ধরন ও অন্যান্য উপসর্গ বিবেচনা করে চিকিৎসক প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নির্ধারণ করেন।
অনেকের অন্য কোনো সমস্যার জন্য পেটের আলট্রাসনোগ্রাফি করানোর সময় ঘটনাক্রমে পিত্তথলির পাথর ধরা পড়ে। তাঁদের কোনো ব্যথা বা অন্য উপসর্গ নাও থাকতে পারে।
এ ধরনের উপসর্গহীন পাথরের ক্ষেত্রে সাধারণত নিয়মিত অপারেশন প্রয়োজন হয় না। তবে কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে চিকিৎসক আলাদা সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
না, পিত্তথলিতে পাথর ধরা পড়লেই সবার অপারেশন করতে হয় না। পাথর উপসর্গ সৃষ্টি করছে কি না, পিত্তথলিতে প্রদাহ হয়েছে কি না এবং পিত্তনালিতে বাধা বা অন্য জটিলতা আছে কি না—এসব বিবেচনা করে চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
আলট্রাসনোগ্রাফিতে পাথর ধরা পড়লেও যদি কোনো উপসর্গ বা জটিলতা না থাকে, তাহলে অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসক অপারেশন না করে পর্যবেক্ষণের পরামর্শ দেন।
এক্ষেত্রে রোগীকে পেটব্যথা, জ্বর, জন্ডিস বা অন্য সতর্কতামূলক লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে বলা হয়।
তবে বিশেষ কিছু রোগীর ক্ষেত্রে জটিলতার ঝুঁকি, অন্য রোগের অবস্থা বা পরীক্ষার ফলাফল অনুযায়ী অপারেশন বিবেচনা করা হতে পারে। তাই উপসর্গহীন পাথরের ক্ষেত্রেও ব্যক্তিগত চিকিৎসা-পরামর্শ গুরুত্বপূর্ণ।
পিত্তথলির পাথরের কারণে বারবার ব্যথা হলে একে উপসর্গযুক্ত পিত্তথলির পাথর বলা হয়। পাথর পিত্তথলির মুখে বাধা সৃষ্টি করার কারণে এমন ব্যথা হতে পারে।
এ ধরনের রোগীর ক্ষেত্রে পিত্তথলি অপসারণের অপারেশন (Cholecystectomy) সাধারণত বিবেচনা করা হয়। কারণ, পাথর রেখে দিলে আবার ব্যথা হতে পারে এবং কিছু রোগীর ক্ষেত্রে পরবর্তী সময়ে জটিলতা দেখা দিতে পারে।
অপারেশনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সার্জন রোগীর বয়স, অন্যান্য রোগ, পরীক্ষার ফলাফল ও অপারেশনের ঝুঁকি মূল্যায়ন করেন।
পাথরের কারণে পিত্তথলিতে প্রদাহ (Acute Cholecystitis) হলে পেটের ওপরের ডান পাশে স্থায়ী ব্যথা, জ্বর, বমি বমি ভাব বা পেটে স্পর্শ করলে ব্যথা হতে পারে।
এক্ষেত্রে হাসপাতালে চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে। রোগীর অবস্থা অনুযায়ী ব্যথা নিয়ন্ত্রণ, শিরায় তরল, প্রয়োজন হলে অ্যান্টিবায়োটিক এবং পিত্তথলি অপসারণের অপারেশন করা হতে পারে।
জটিলতা দেখা দিলে চিকিৎসার সময় ও পদ্ধতি রোগীর অবস্থা অনুযায়ী নির্ধারণ করা হয়। নিজে থেকে অ্যান্টিবায়োটিক বা ব্যথার ওষুধ খেয়ে চিকিৎসা বিলম্বিত করা উচিত নয়।
পিত্তথলির পাথর এবং পিত্তনালির পাথর এক বিষয় নয়। পাথর পিত্তনালিতে আটকে গেলে পিত্তরসের প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এতে জন্ডিস, পিত্তনালির সংক্রমণ বা অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহের ঝুঁকি বাড়ে।
পিত্তনালিতে পাথর সন্দেহ হলে চিকিৎসক রক্ত পরীক্ষা, আলট্রাসনোগ্রাফি, MRCP বা অন্য পরীক্ষা করতে পারেন। প্রয়োজন হলে ERCP নামের এন্ডোস্কোপিক পদ্ধতিতে পিত্তনালি থেকে পাথর বের করা হয়।
পিত্তনালির পাথর অপসারণের পর পিত্তথলিতে পাথর থাকলে সেটির চিকিৎসাও আলাদাভাবে পরিকল্পনা করা হতে পারে। কোন পদ্ধতি প্রয়োজন, তা রোগীর অবস্থার ওপর নির্ভর করে।
পিত্তথলির পাথর শনাক্ত করতে রোগীর উপসর্গ, শারীরিক পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা একসঙ্গে বিবেচনা করা হয়।
পেটের আলট্রাসনোগ্রাফি (Abdominal Ultrasound) পিত্তথলির পাথর শনাক্ত করার প্রধান পরীক্ষাগুলোর একটি। এতে পিত্তথলিতে পাথর আছে কি না, পিত্তথলির দেয়াল মোটা হয়েছে কি না এবং আশপাশে প্রদাহের কিছু লক্ষণ আছে কি না, তা দেখা যেতে পারে।
তবে পিত্তনালির সব অংশে থাকা পাথর আলট্রাসনোগ্রাফিতে সবসময় ধরা পড়ে না। উপসর্গ বা রক্ত পরীক্ষার ফলাফলে পিত্তনালিতে বাধার সন্দেহ থাকলে আরও পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে।
লিভার ফাংশন টেস্ট (Liver Function Test বা LFT) হলো রক্তের কিছু পরীক্ষার সমষ্টি, যা যকৃতের কার্যক্রম এবং পিত্তরস চলাচলে বাধার সম্ভাবনা মূল্যায়নে সাহায্য করে।
পিত্তনালিতে পাথরের সন্দেহ, জন্ডিস বা অন্যান্য জটিলতার লক্ষণ থাকলে চিকিৎসক বিলিরুবিন, ALT, AST, ALP এবং GGT-এর মতো পরীক্ষাগুলো দিতে পারেন। প্রয়োজনে রক্তের অন্যান্য পরীক্ষাও করা হয়।
শুধু LFT দিয়ে পিত্তথলির পাথর নিশ্চিত করা যায় না। ফলাফলকে উপসর্গ ও অন্যান্য পরীক্ষার সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হয়।
MRCP (Magnetic Resonance Cholangiopancreatography) হলো বিশেষ ধরনের MRI পরীক্ষা, যার মাধ্যমে পিত্তনালি ও অগ্ন্যাশয়ের নালির ছবি পাওয়া যায়। আলট্রাসনোগ্রাফিতে পাথর স্পষ্ট না হলেও পিত্তনালিতে পাথরের সন্দেহ থাকলে চিকিৎসক এটি করতে পারেন।
কিছু ক্ষেত্রে Endoscopic Ultrasound (EUS) বা অন্য পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে। কোন পরীক্ষা উপযুক্ত হবে, তা রোগীর উপসর্গ, রক্ত পরীক্ষার ফলাফল ও প্রাথমিক ইমেজিংয়ের ওপর নির্ভর করে।
ERCP (Endoscopic Retrograde Cholangiopancreatography) একটি এন্ডোস্কোপিক পদ্ধতি, যার সাহায্যে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে পিত্তনালির পাথর বের করা বা নালিতে বাধা দূর করা যায়।
পিত্তনালিতে পাথর থাকার জোরালো প্রমাণ, পিত্তনালিতে বাধা বা পিত্তনালির সংক্রমণের মতো পরিস্থিতিতে ERCP প্রয়োজন হতে পারে।
এটি সাধারণ আলট্রাসনোগ্রাফির বিকল্প নয় এবং শুধু পিত্তথলিতে পাথর আছে বলেই সবার ERCP লাগে না। পদ্ধতিটির কিছু ঝুঁকি রয়েছে, তাই চিকিৎসক প্রয়োজন ও ঝুঁকি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেন।
পিত্তথলির পাথরের কারণে বারবার উপসর্গ বা জটিলতা হলে পিত্তথলি অপসারণের অপারেশন করা হতে পারে। অপারেশনের পদ্ধতি রোগীর শারীরিক অবস্থা, প্রদাহের মাত্রা এবং অন্যান্য চিকিৎসাগত বিষয় বিবেচনা করে নির্ধারণ করা হয়।
Laparoscopic Cholecystectomy হলো ছোট কয়েকটি ছিদ্রের মাধ্যমে ক্যামেরা ও বিশেষ যন্ত্র ব্যবহার করে পিত্তথলি অপসারণের অপারেশন। এটি পিত্তথলির পাথরের ক্ষেত্রে বহুল ব্যবহৃত পদ্ধতি।
এই পদ্ধতিতে সাধারণত বড় কাটার প্রয়োজন হয় না। অনেক রোগী ওপেন সার্জারির তুলনায় দ্রুত স্বাভাবিক কাজে ফিরতে পারেন। তবে সবার ক্ষেত্রে একই সময় লাগে না।
Open Cholecystectomy-তে পেটে তুলনামূলক বড় কাটা দিয়ে পিত্তথলি অপসারণ করা হয়।
তীব্র প্রদাহ, জটিল শারীরিক অবস্থা, আগের অপারেশনের কারণে তৈরি আঠালো টিস্যু বা অপারেশনের সময় নিরাপদে ল্যাপারোস্কোপিক পদ্ধতিতে কাজ করা সম্ভব না হলে ওপেন সার্জারি প্রয়োজন হতে পারে।
কিছু ক্ষেত্রে ল্যাপারোস্কোপিক অপারেশন শুরু করার পর নিরাপত্তার জন্য ওপেন সার্জারিতে পরিবর্তন করতে হয়। এটি রোগীর নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে নেওয়া সিদ্ধান্ত।
হ্যাঁ, পিত্তথলি অপসারণের পর অধিকাংশ মানুষ স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।
পিত্তথলি পিত্তরস জমা রাখে, কিন্তু পিত্তরস তৈরি করে যকৃত। পিত্তথলি অপসারণের পরও যকৃত পিত্তরস তৈরি করে এবং তা সরাসরি অন্ত্রে প্রবাহিত হয়।
অপারেশনের পর কিছু মানুষের সাময়িকভাবে পাতলা পায়খানা, পেট ফাঁপা বা নির্দিষ্ট খাবার খেলে অস্বস্তি হতে পারে। এসব সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে বা বাড়তে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
ল্যাপারোস্কোপিক অপারেশনের পর অনেক রোগী তুলনামূলক দ্রুত স্বাভাবিক কাজে ফিরতে পারেন। ওপেন সার্জারির ক্ষেত্রে সুস্থ হতে সাধারণত বেশি সময় লাগে। সঠিক সময় নির্ভর করে অপারেশনের ধরন, রোগীর শারীরিক অবস্থা এবং কোনো জটিলতা হয়েছে কি না তার ওপর।
অপারেশনের পর:
চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী ধীরে ধীরে স্বাভাবিক খাবারে ফিরুন।
শুরুতে অল্প পরিমাণে খাবার খান এবং সহ্য হলে পরিমাণ বাড়ান।
অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত খাবারে অস্বস্তি হলে সাময়িকভাবে তা কমিয়ে দিন।
পর্যাপ্ত পানি পান করুন এবং চিকিৎসকের অনুমতি অনুযায়ী হাঁটাচলা শুরু করুন।
ক্ষতস্থানের যত্ন ও ফলোআপের নির্দেশনা মেনে চলুন।
অপারেশনের পর জ্বর, বাড়তে থাকা পেটব্যথা, ক্ষতস্থান থেকে পুঁজ বা অতিরিক্ত রক্তপাত, জন্ডিস কিংবা বারবার বমি হলে দ্রুত চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।
পিত্তথলির পাথর অনেক সময় কোনো সমস্যা তৈরি করে না। তবে পাথর পিত্তথলি বা পিত্তনালিতে বাধা সৃষ্টি করলে বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিতে পারে।
পাথর পিত্তথলির মুখে আটকে গেলে পিত্তরসের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে প্রদাহ হতে পারে। একে Acute Cholecystitis বলা হয়।
লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে:
পেটের ওপরের ডান পাশে স্থায়ী ব্যথা।
জ্বর।
বমি বমি ভাব বা বমি।
পেটের নির্দিষ্ট স্থানে চাপ দিলে ব্যথা।
এ ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন।
পাথর পিত্তনালিতে আটকে গেলে পিত্তরসের প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এতে রক্তে বিলিরুবিন বেড়ে চোখ ও ত্বক হলুদ হয়ে যেতে পারে।
এ ছাড়া প্রস্রাব গাঢ় হওয়া, পায়খানা ফ্যাকাশে হওয়া এবং শরীরে চুলকানির মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। জন্ডিস হলে দ্রুত চিকিৎসকের মূল্যায়ন প্রয়োজন।
পিত্তনালিতে বাধার সঙ্গে সংক্রমণ হলে Cholangitis হতে পারে। এটি গুরুতর এবং দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন এমন একটি অবস্থা।
সম্ভাব্য লক্ষণ:
জ্বর বা কাঁপুনি।
পেটের ওপরের ডান পাশে ব্যথা।
চোখ বা ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়া।
রোগ গুরুতর হলে রক্তচাপ কমে যাওয়া, বিভ্রান্তি বা অচেতনতার মতো লক্ষণও দেখা দিতে পারে। সন্দেহ হলে জরুরি বিভাগে যেতে হবে।
পিত্তনালির শেষ অংশে পাথর আটকে গেলে অগ্ন্যাশয়ের নালির প্রবাহেও সমস্যা হতে পারে। এর ফলে অগ্ন্যাশয়ে প্রদাহ বা Gallstone Pancreatitis দেখা দিতে পারে।
এর লক্ষণ হতে পারে পেটের ওপরের অংশে তীব্র ও স্থায়ী ব্যথা, যা পিঠে ছড়িয়ে পড়তে পারে, সঙ্গে বমি বা বমি বমি ভাব।
এটি গুরুতর হতে পারে এবং হাসপাতালে চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।
পিত্তথলির পাথর ধরা পড়ার পর নিচের লক্ষণগুলোর কোনোটি দেখা দিলে দেরি না করে জরুরি চিকিৎসা নিন।
পেটের ওপরের ডান পাশে বা ওপরের মাঝামাঝি অংশে তীব্র ব্যথা হলে, বিশেষ করে ব্যথা কয়েক ঘণ্টা ধরে চললে বা ক্রমে বাড়লে, দ্রুত চিকিৎসা নিন।
পেটব্যথার সঙ্গে জ্বর বা কাঁপুনি থাকলে পিত্তথলি বা পিত্তনালিতে প্রদাহ কিংবা সংক্রমণের আশঙ্কা থাকে। দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন।
চোখের সাদা অংশ বা ত্বক হলুদ হয়ে গেলে পিত্তনালিতে বাধা বা যকৃত-সম্পর্কিত অন্য সমস্যার সম্ভাবনা থাকে। দ্রুত চিকিৎসকের মূল্যায়ন প্রয়োজন।
তীব্র পেটব্যথার সঙ্গে বারবার বমি হলে পানিশূন্যতা ও গুরুতর জটিলতার ঝুঁকি থাকতে পারে। বাড়িতে চিকিৎসা করে অপেক্ষা না করে চিকিৎসা নিন।
গাঢ় প্রস্রাব, ফ্যাকাশে পায়খানা এবং জন্ডিস একসঙ্গে দেখা দিলে পিত্তরসের প্রবাহে বাধার সম্ভাবনা থাকে। দ্রুত পরীক্ষা করানো প্রয়োজন।
মনে রাখুন: তীব্র ব্যথা, জ্বর, জন্ডিস বা ব্যথার সঙ্গে বারবার বমি হলে শুধু নিয়মিত অ্যাপয়েন্টমেন্টের জন্য অপেক্ষা করবেন না। জরুরি বিভাগে যান।
পিত্তথলির পাথর গলানোর জন্য আপেল, আপেলের জুস, ভেষজ উপাদান বা তথাকথিত Gallbladder Flush ব্যবহারের কথা প্রচলিত আছে। কিন্তু এসব পদ্ধতি পিত্তথলির পাথর নিরাপদে ও নির্ভরযোগ্যভাবে গলিয়ে দেয়—এমন পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
আপেল, আপেলের জুস বা Apple Cider Vinegar খেলে পিত্তথলির পাথর গলে যায়—এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।
আপেল ও অন্যান্য ফল সুষম খাদ্যের অংশ হতে পারে, কিন্তু এগুলোকে পাথরের চিকিৎসা হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। পাথরের কারণে ব্যথা বা জটিলতা হলে শুধু জুস খেয়ে অপেক্ষা করলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পেতে দেরি হতে পারে।
কিছু পদ্ধতিতে তেল, জুস বা ভেষজ উপাদান খেয়ে পিত্তথলির পাথর বের করার দাবি করা হয়। এসব পদ্ধতিতে মলের সঙ্গে যে দানার মতো পদার্থ দেখা যেতে পারে, তা প্রকৃত পিত্তথলির পাথর নাও হতে পারে।
এ ধরনের পদ্ধতি বমি, ডায়রিয়া, পেটব্যথা বা অন্য সমস্যা তৈরি করতে পারে। এগুলো পাথর অপসারণের প্রমাণিত বিকল্প নয়।
কিছু নির্দিষ্ট ধরনের ছোট কোলেস্টেরল পাথরের ক্ষেত্রে নির্বাচিত রোগীদের জন্য পাথর গলানোর ওষুধ ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে সব পাথর এভাবে গলে না, চিকিৎসায় দীর্ঘ সময় লাগতে পারে এবং ওষুধ বন্ধ করার পর পাথর আবার তৈরি হতে পারে।
তাই নিজে থেকে ওষুধ খাওয়া বা ঘরোয়া পদ্ধতির ওপর নির্ভর করা ঠিক নয়। উপসর্গ, পাথরের ধরন ও অবস্থান অনুযায়ী চিকিৎসক উপযুক্ত ব্যবস্থা নির্ধারণ করবেন।
শুধু পাথর ছোট বলে অপারেশন লাগবে বা লাগবে না—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। পাথর উপসর্গ সৃষ্টি করছে কি না, পিত্তনালিতে বাধা আছে কি না এবং অন্য কোনো জটিলতা রয়েছে কি না, সেগুলো বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
উপসর্গহীন পাথরে অনেক সময় পর্যবেক্ষণ করা যায়। তবে ব্যথা বা জটিলতা থাকলে অপারেশন বিবেচনা করা হতে পারে।
নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে নির্বাচিত রোগীর ছোট কোলেস্টেরল পাথর গলানোর ওষুধ ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে এটি সবার জন্য কার্যকর নয় এবং সব ধরনের পাথর গলাতে পারে না।
উপসর্গযুক্ত পিত্তথলির পাথরের ক্ষেত্রে অনেক সময় পিত্তথলি অপসারণের অপারেশন বেশি উপযুক্ত হয়। চিকিৎসক পরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত নেবেন।
কিছু নির্বাচিত ক্ষেত্রে ওষুধ দিয়ে নির্দিষ্ট ধরনের পাথর গলানোর চেষ্টা করা যায়। কিন্তু এটি সাধারণ চিকিৎসা নয় এবং ফলাফল নিশ্চিত নয়। পিত্তনালিতে পাথর আটকে গেলে ERCP-এর মাধ্যমে পাথর বের করা হতে পারে, তবে এটি পিত্তথলি অপসারণের অপারেশনের সমতুল্য নয়।
উপসর্গহীন পাথরের ক্ষেত্রে চিকিৎসক অপারেশন ছাড়াই পর্যবেক্ষণের পরামর্শ দিতে পারেন। অর্থাৎ পাথর দূর করা, পাথর রেখে পর্যবেক্ষণ করা এবং পাথরের জটিলতার চিকিৎসা—এগুলো আলাদা বিষয়।
অপারেশনের পর অধিকাংশ মানুষ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক খাবারে ফিরতে পারেন। প্রথম দিকে অল্প পরিমাণে খাবার খাওয়া এবং অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত খাবারে অস্বস্তি হলে তা কমানো সহায়ক হতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদে সবার জন্য কঠোর চর্বিমুক্ত খাদ্য প্রয়োজন হয় না। খাবার সহ্য করার ক্ষমতা অনুযায়ী খাদ্যাভ্যাস ঠিক করুন এবং চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুসরণ করুন।
পিত্তথলির পাথরের জন্য সাধারণ সার্জন (General Surgeon) বা ল্যাপারোস্কোপিক সার্জনের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে। রোগীর উপসর্গ ও পরীক্ষার ফলাফল অনুযায়ী গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট বা অন্যান্য বিশেষজ্ঞের মূল্যায়নও প্রয়োজন হতে পারে।
জ্বর, জন্ডিস, তীব্র পেটব্যথা বা বারবার বমি থাকলে নিয়মিত অ্যাপয়েন্টমেন্টের জন্য অপেক্ষা না করে জরুরি বিভাগে যান।
চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার সময় আলট্রাসনোগ্রাফি, রক্ত পরীক্ষার রিপোর্ট, বর্তমানে ব্যবহৃত ওষুধের তালিকা এবং আগের চিকিৎসার তথ্য সঙ্গে রাখুন।
চিকিৎসা-সংক্রান্ত সতর্কতা: এই নিবন্ধটি সাধারণ স্বাস্থ্যতথ্যের জন্য। এটি ব্যক্তিগত রোগ নির্ণয় বা চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। পিত্তথলির পাথরের চিকিৎসা নির্ধারণের জন্য রোগীর উপসর্গ, পরীক্ষার ফলাফল ও সামগ্রিক স্বাস্থ্য বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তথ্যসূত্র: NIDDK (National Institute of Diabetes and Digestive and Kidney Diseases), NHS এবং প্রাসঙ্গিক ক্লিনিক্যাল গাইডলাইন। প্রকাশের আগে ব্যবহৃত নির্দিষ্ট তথ্যসূত্র ও সর্বশেষ নির্দেশনা যাচাই করে লিংক যুক্ত করুন।
Content Source: Doctors24 Official YouTube Channel
Medical Expert Featured: ডা. মুরশিদুল আরেফিন, এমবিবিএস, এমএস (হেপাটোবিলিয়ারি সার্জারি), হেপাটোবিলিয়ারি সার্জন, বিশেষজ্ঞ, হেপাটোবিলিয়ারি সার্জারি বিভাগ, পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
Content Prepared & Published By: Doctors24 Editorial Team
Last Updated: 14 October 2026 • Read Editorial Policy →
Connect with experienced hepatobiliary surgeon near you for consultation and treatment.
33 Doctors
3 Doctors
2 Doctors
1 Doctors
2 Doctors
0 Doctors
Read More About This Topic