PCOS-এর কারণ, লক্ষণ, মাসিক অনিয়ম, বন্ধ্যাত্বের ঝুঁকি ও বিশেষজ্ঞের পরামর্শ

পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম বা PCOS (Polycystic Ovary Syndrome) হলো প্রজননক্ষম বয়সী নারীদের মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ হরমোনজনিত সমস্যাগুলোর একটি। এটি শুধু মাসিক অনিয়মের কারণ নয়, বরং ওজন বৃদ্ধি, ব্রণ, অতিরিক্ত লোম, চুল পড়া, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স এবং ভবিষ্যতে ডায়াবেটিস বা হৃদ্রোগের ঝুঁকির সঙ্গেও সম্পর্কিত হতে পারে।
অনেকেই মনে করেন PCOS থাকলে কখনো সন্তান ধারণ করা সম্ভব নয়। বাস্তবে এটি সঠিক নয়। সময়মতো রোগ নির্ণয়, জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসার মাধ্যমে PCOS আক্রান্ত অনেক নারী সফলভাবে গর্ভধারণ করতে পারেন।
এই ভিডিওতে স্ত্রীরোগ ও বন্ধ্যাত্ব বিশেষজ্ঞ ডাঃ সোহেলী নার্গিস PCOS কী, কেন হয়, কীভাবে নির্ণয় করা হয়, চিকিৎসা, ওজন নিয়ন্ত্রণ, মাসিক অনিয়ম এবং সন্তান নেওয়ার সম্ভাবনা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।
PCOS হলো একটি হরমোনজনিত (Hormonal) ও বিপাকীয় (Metabolic) অবস্থা, যেখানে ডিম্বাশয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং নিয়মিত ডিম্বস্ফোটন (Ovulation) নাও হতে পারে।
PCOS-এ শরীরে কিছু হরমোনের ভারসাম্য পরিবর্তিত হয়। বিশেষ করে অ্যান্ড্রোজেন (পুরুষ হরমোন)-এর মাত্রা তুলনামূলক বেড়ে যেতে পারে, যার ফলে মাসিক অনিয়ম, ব্রণ, অতিরিক্ত লোম এবং ডিম্বস্ফোটনের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
PCOS একটি সিনড্রোম, অর্থাৎ একাধিক লক্ষণ ও হরমোনজনিত পরিবর্তনের সমন্বয়।
অন্যদিকে Polycystic Ovary (PCO) বলতে শুধু আল্ট্রাসোনোগ্রাফিতে ডিম্বাশয়ে অনেক ছোট ফলিকল (Follicle) দেখা যাওয়াকে বোঝায়। সব PCO-যুক্ত নারীর PCOS থাকে না, আবার PCOS থাকা সবার আল্ট্রাসোনোগ্রাফিতে একই ধরনের চিত্র নাও দেখা যেতে পারে।
PCOS-এর নির্দিষ্ট একক কারণ জানা যায়নি। সাধারণত একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করে।
হরমোনের ভারসাম্যহীনতার কারণে নিয়মিত ডিম্বস্ফোটন ব্যাহত হতে পারে।
অনেক PCOS রোগীর শরীরে Insulin Resistance থাকে। এতে শরীর বেশি ইনসুলিন তৈরি করতে পারে, যা অ্যান্ড্রোজেন হরমোনের মাত্রা বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে।
পরিবারে মা, বোন বা নিকট আত্মীয়ের PCOS থাকলে ঝুঁকি কিছুটা বেশি হতে পারে।
শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, অতিরিক্ত ক্যালোরিযুক্ত খাদ্যাভ্যাস এবং ওজন বৃদ্ধি PCOS-এর উপসর্গকে আরও প্রকট করতে পারে।
সব রোগীর ক্ষেত্রে একই ধরনের লক্ষণ দেখা যায় না।
PCOS-এর সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণগুলোর একটি হলো:
মাসিক দেরিতে হওয়া
অনেক মাস মাসিক না হওয়া
অনিয়মিত মাসিক
বিশেষ করে মুখ, বুক বা পিঠে দীর্ঘদিনের ব্রণ দেখা দিতে পারে।
মুখ, থুতনি, বুক বা পেটে পুরুষদের মতো অতিরিক্ত লোম গজাতে পারে।
অনেক রোগীর সহজেই ওজন বেড়ে যায় বা ওজন কমাতে অসুবিধা হয়।
মাথার চুল পাতলা হয়ে যাওয়া বা অতিরিক্ত চুল পড়াও PCOS-এর একটি লক্ষণ হতে পারে।
এছাড়াও কিছু রোগীর ক্ষেত্রে দেখা যেতে পারে:
গর্ভধারণে সমস্যা
ঘাড় বা বগলে কালচে দাগ (Acanthosis Nigricans)
ত্বক অতিরিক্ত তৈলাক্ত হওয়া
চিকিৎসক মাসিকের ইতিহাস, ওজন, ত্বক, অতিরিক্ত লোম, ব্রণ এবং অন্যান্য উপসর্গ মূল্যায়ন করেন।
আল্ট্রাসোনোগ্রাফির মাধ্যমে ডিম্বাশয়ের গঠন মূল্যায়ন করা হয়। তবে শুধু আল্ট্রাসোনোগ্রাফির ভিত্তিতে PCOS নির্ণয় করা যায় না।
প্রয়োজনে বিভিন্ন হরমোন এবং রক্তের কিছু পরীক্ষা করা হতে পারে, যেমন:
রক্তে শর্করা (Blood Sugar)
Lipid Profile
Thyroid Function
Prolactin
অন্যান্য হরমোন পরীক্ষা (উপসর্গ অনুযায়ী)
বর্তমানে PCOS নির্ণয়ে বহুল ব্যবহৃত Rotterdam Criteria অনুযায়ী সাধারণভাবে নিম্নের তিনটির মধ্যে অন্তত দুটি বৈশিষ্ট্য থাকলে (এবং অন্য কারণ বাদ দেওয়ার পর) PCOS বিবেচনা করা হয়:
অনিয়মিত বা অনুপস্থিত ডিম্বস্ফোটন
অ্যান্ড্রোজেনের মাত্রা বৃদ্ধি বা তার লক্ষণ
আল্ট্রাসোনোগ্রাফিতে Polycystic Ovary-এর বৈশিষ্ট্য
চিকিৎসা নির্ভর করে রোগীর বয়স, উপসর্গ এবং সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনার ওপর।
চিকিৎসার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো:
স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস
নিয়মিত ব্যায়াম
ওজন নিয়ন্ত্রণ
পর্যাপ্ত ঘুম
উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসক মাসিক নিয়ন্ত্রণ, ব্রণ, অতিরিক্ত লোম, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বা অন্যান্য সমস্যার জন্য ওষুধ দিতে পারেন।
দীর্ঘদিন মাসিক বন্ধ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী মাসিক নিয়ন্ত্রণের চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে।
যারা গর্ভধারণের পরিকল্পনা করছেন, তাদের ক্ষেত্রে ডিম্বস্ফোটন (Ovulation) ঘটাতে সহায়ক ওষুধ বা প্রয়োজনে অন্যান্য Fertility Treatment বিবেচনা করা হতে পারে।
ওজন নিয়ন্ত্রণ অনেক রোগীর ক্ষেত্রে PCOS-এর উপসর্গ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
পরিমিত ক্যালোরি গ্রহণ
পর্যাপ্ত শাকসবজি ও ফল
সম্পূর্ণ শস্য
স্বাস্থ্যকর প্রোটিন
অতিরিক্ত চিনি ও প্রক্রিয়াজাত খাবার কমানো
সপ্তাহে নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম ইনসুলিন সংবেদনশীলতা উন্নত করতে এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে।
যাদের অতিরিক্ত ওজন রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে মোট শরীরের ওজনের প্রায় ৫–১০% কমাতে পারলেও অনেকের মাসিক নিয়মিত হওয়া, ডিম্বস্ফোটন এবং বিপাকীয় স্বাস্থ্যের উন্নতি দেখা যেতে পারে। তবে ফল ব্যক্তি ভেদে ভিন্ন হতে পারে।
PCOS-এর কারণে ডিম্বস্ফোটন অনিয়মিত হতে পারে, ফলে গর্ভধারণে সময় বেশি লাগতে পারে। তবে এটি স্থায়ী বন্ধ্যাত্বের সমান নয়।
বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন যদি:
নিয়মিত চেষ্টা করার পরও গর্ভধারণ না হয়
মাসিক দীর্ঘদিন অনিয়মিত থাকে
ডিম্বস্ফোটনের সমস্যা সন্দেহ হয়
জীবনযাত্রার পরিবর্তন, ওষুধ এবং প্রয়োজনে আধুনিক Fertility Treatment-এর মাধ্যমে অনেক PCOS রোগী সফলভাবে গর্ভধারণ করতে পারেন।
তিন মাস বা তার বেশি সময় মাসিক না হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত (যদি গর্ভাবস্থা না থাকে)।
এক বছর (বা বয়স ও অন্যান্য ঝুঁকি অনুযায়ী তার আগেই) চেষ্টা করার পরও গর্ভধারণ না হলে মূল্যায়ন প্রয়োজন।
হঠাৎ ওজন বৃদ্ধি, অতিরিক্ত লোম, তীব্র ব্রণ বা দ্রুত চুল পড়া হলে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।
এছাড়াও চিকিৎসকের পরামর্শ নিন যদি:
অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়
ডায়াবেটিসের লক্ষণ দেখা দেয়
তীব্র তলপেট ব্যথা হয়
PCOS একটি দীর্ঘমেয়াদি অবস্থা। তবে সঠিক চিকিৎসা ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমে অধিকাংশ উপসর্গ কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
হ্যাঁ। অনেক PCOS রোগী চিকিৎসার মাধ্যমে স্বাভাবিকভাবে বা Fertility Treatment-এর সাহায্যে সফলভাবে গর্ভধারণ করেন।
না। স্বাভাবিক ওজনের নারীদেরও PCOS হতে পারে।
না। PCOS নির্ণয়ের জন্য শুধু আল্ট্রাসোনোগ্রাফি যথেষ্ট নয়।
হ্যাঁ। বিশেষ করে Insulin Resistance থাকলে ভবিষ্যতে Type 2 Diabetes-এর ঝুঁকি বাড়তে পারে।
PCOS একটি নিয়ন্ত্রণযোগ্য অবস্থা। তাই মাসিক অনিয়ম, অতিরিক্ত লোম, ব্রণ, ওজন বৃদ্ধি বা গর্ভধারণে সমস্যা হলে দেরি না করে স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ বা প্রজনন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। যত দ্রুত রোগ নির্ণয় হবে, তত দ্রুত উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ, ভবিষ্যতের জটিলতা প্রতিরোধ এবং সন্তান ধারণের সম্ভাবনা বাড়ানো সম্ভব।
Content Source: Doctors24 Official YouTube Channel
Medical Expert Featured: ডাঃ সোহেলী নার্গিস, এমবিবিএস, এফসিপিএস, সিসিডি (বারডেম) সিএমইউ (বিআইটিএমআইআর) সহযোগী অধ্যাপক (গাইনী এন্ড অবস), আহ্ছানিয়া মিশন মেডিকেল কলেজ, ক্যান্সার এন্ড জেনারেল হাসপাতাল, উত্তরা, ঢাকা।
Content Prepared & Published By: Doctors24 Editorial Team
Last Updated: 18 July 2026 • Read Editorial Policy →
Connect with experienced gynecologist near you for consultation and treatment.