হেপাটাইটিস A, B, C ও E-এর পার্থক্য, পরীক্ষা, চিকিৎসা এবং লিভার সুস্থ রাখার উপায়

হেপাটাইটিস (Hepatitis) হলো লিভারের প্রদাহ, যা প্রধানত ভাইরাসের সংক্রমণের কারণে হয়। বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও হেপাটাইটিস বি (Hepatitis B) এবং হেপাটাইটিস সি (Hepatitis C) দীর্ঘমেয়াদি লিভার রোগ, লিভার সিরোসিস (Cirrhosis) এবং লিভার ক্যান্সারের গুরুত্বপূর্ণ কারণ। অন্যদিকে হেপাটাইটিস A ও E সাধারণত দূষিত খাবার ও পানির মাধ্যমে ছড়ায় এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে স্বল্পমেয়াদি সংক্রমণ সৃষ্টি করে।
অনেক মানুষের শরীরে বছরের পর বছর হেপাটাইটিস বি বা সি ভাইরাস থাকতে পারে, কিন্তু কোনো লক্ষণ নাও থাকতে পারে। এ কারণেই একে অনেক সময় "Silent Infection" বলা হয়। সময়মতো পরীক্ষা, সঠিক চিকিৎসা এবং টিকা গ্রহণের মাধ্যমে হেপাটাইটিসের অনেক ক্ষেত্রেই জটিলতা প্রতিরোধ করা সম্ভব।
এই ভিডিওতে লিভার বিশেষজ্ঞ ডা. সুস্মিতা ইসলাম হেপাটাইটিস কী, কীভাবে ছড়ায়, বিভিন্ন ধরনের পার্থক্য, পরীক্ষা, চিকিৎসা এবং লিভার সুরক্ষার উপায় সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।
হেপাটাইটিস হলো লিভারের প্রদাহ (Inflammation of the Liver)। ভাইরাস, কিছু ওষুধ, অতিরিক্ত অ্যালকোহল, অটোইমিউন রোগ বা অন্যান্য কারণেও লিভারে প্রদাহ হতে পারে। তবে ভাইরাল হেপাটাইটিস সবচেয়ে বেশি পরিচিত।
হেপাটাইটিস ভাইরাস লিভারের কোষে সংক্রমণ ঘটায়। সংক্রমণের বিরুদ্ধে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা প্রতিক্রিয়া দেখায়, যার ফলে লিভারে প্রদাহ সৃষ্টি হয়। দীর্ঘদিন প্রদাহ চলতে থাকলে লিভারে ক্ষত (Fibrosis), সিরোসিস এবং কিছু ক্ষেত্রে লিভার ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
না। জন্ডিস (Jaundice) একটি লক্ষণ, আর হেপাটাইটিস একটি রোগ। হেপাটাইটিসে জন্ডিস হতে পারে, কিন্তু জন্ডিসের আরও অনেক কারণ রয়েছে, যেমন পিত্তনালির বাধা, পিত্তথলির পাথর, কিছু রক্তের রোগ বা অন্যান্য লিভারের সমস্যা।
সাধারণত দূষিত খাবার ও পানির মাধ্যমে ছড়ায়।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে স্বল্পমেয়াদি (Acute) সংক্রমণ হয়।
সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি লিভার রোগ সৃষ্টি করে না।
রক্ত, শরীরের তরল এবং মা থেকে নবজাতকের মধ্যে সংক্রমিত হতে পারে।
কিছু মানুষের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি (Chronic) সংক্রমণে পরিণত হয়।
চিকিৎসা না হলে সিরোসিস ও লিভার ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
কার্যকর টিকা (Vaccine) রয়েছে।
প্রধানত সংক্রমিত রক্তের মাধ্যমে ছড়ায়।
অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি সংক্রমণ সৃষ্টি করে।
বর্তমানে কার্যকর ওষুধের মাধ্যমে অধিকাংশ রোগীর ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নিরাময় (Cure) সম্ভব।
দূষিত খাবার ও পানির মাধ্যমে ছড়ায়।
সাধারণত স্বল্পমেয়াদি সংক্রমণ হয়।
গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে জটিলতার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হতে পারে।
হেপাটাইটিস A এবং E সাধারণত দূষিত পানি, অপরিষ্কার খাবার এবং দুর্বল স্যানিটেশনের মাধ্যমে ছড়ায়।
হেপাটাইটিস B এবং C ছড়াতে পারে:
সংক্রমিত রক্তের মাধ্যমে
জীবাণুমুক্ত নয় এমন সূঁচ বা সিরিঞ্জ ব্যবহারে
অপরীক্ষিত রক্ত সঞ্চালনে
কিছু ক্ষেত্রে যৌন সংস্পর্শের মাধ্যমে (বিশেষ করে Hepatitis B)
হেপাটাইটিস বি আক্রান্ত মায়ের কাছ থেকে প্রসবের সময় শিশুর শরীরে ভাইরাস সংক্রমিত হতে পারে। তবে জন্মের পর সময়মতো টিকা এবং প্রয়োজনে অতিরিক্ত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিলে এই ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যায়।
হেপাটাইটিস বি বা সি সাধারণত নিচের উপায়ে ছড়ায় না:
একসঙ্গে খাওয়া
করমর্দন
আলিঙ্গন
একই টয়লেট ব্যবহার
কাশি বা হাঁচি
একই প্লেট বা গ্লাস ব্যবহার (স্বাভাবিক ব্যবহারে)
তাই হেপাটাইটিস আক্রান্ত ব্যক্তিকে সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন করা উচিত নয়।
অনেকের ক্ষেত্রে দেখা দিতে পারে:
দুর্বলতা
ক্ষুধামন্দা
বমি বমি ভাব
জ্বর
পেশি বা শরীর ব্যথা
ডান পাশের ওপরের পেটে অস্বস্তি
বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি Hepatitis B ও C সংক্রমণে বহু বছর কোনো লক্ষণ নাও থাকতে পারে। এ সময়েও লিভারের ক্ষতি ধীরে ধীরে চলতে পারে।
নিম্নোক্ত লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন:
চোখ ও ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়া (জন্ডিস)
গাঢ় রঙের প্রস্রাব
পেট ফুলে যাওয়া
সহজে রক্তপাত হওয়া
অতিরিক্ত ঘুমঘুম ভাব বা বিভ্রান্তি
তীব্র দুর্বলতা
চিকিৎসক রোগীর ঝুঁকি, উপসর্গ এবং ইতিহাস অনুযায়ী পরীক্ষা নির্ধারণ করেন।
HBsAg পরীক্ষা হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের সংক্রমণ আছে কি না তা নির্ণয়ের জন্য ব্যবহৃত হয়।
Anti-HCV পরীক্ষা হেপাটাইটিস সি ভাইরাসের সংস্পর্শে এসেছেন কি না তা মূল্যায়নে ব্যবহৃত হয়।
ALT, AST এবং অন্যান্য Liver Function Test লিভারের প্রদাহ বা ক্ষতির মাত্রা মূল্যায়নে সাহায্য করে।
যদি হেপাটাইটিস বি বা সি নিশ্চিত হয়, তাহলে চিকিৎসার পরিকল্পনা, ভাইরাসের সক্রিয়তা এবং চিকিৎসার অগ্রগতি মূল্যায়নের জন্য প্রয়োজনে HBV DNA বা HCV RNA পরীক্ষা করা হতে পারে।
চিকিৎসা নির্ভর করে হেপাটাইটিসের ধরন, তীব্রতা এবং রোগীর লিভারের অবস্থার ওপর।
অধিকাংশ ক্ষেত্রে Hepatitis A ও E নিজে থেকেই ভালো হয়ে যায়। চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হলো:
পর্যাপ্ত বিশ্রাম
পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ
পুষ্টিকর খাদ্য
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী উপসর্গভিত্তিক চিকিৎসা
সব Hepatitis B রোগীর অ্যান্টিভাইরাল ওষুধের প্রয়োজন হয় না। লিভারের অবস্থা, ভাইরাসের পরিমাণ, ALT-এর মাত্রা এবং অন্যান্য পরীক্ষার ভিত্তিতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নেন কার চিকিৎসা শুরু করা উচিত।
হ্যাঁ। বর্তমানে Direct-Acting Antiviral (DAA) ওষুধের মাধ্যমে অধিকাংশ Hepatitis C রোগীর ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব, যদি সময়মতো সঠিক চিকিৎসা শুরু করা যায়।
হেপাটাইটিস বি প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো টিকা গ্রহণ। নবজাতক থেকে শুরু করে ঝুঁকিপূর্ণ প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রেও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী টিকা নেওয়া উচিত।
শুধুমাত্র যথাযথভাবে পরীক্ষিত (Screened) রক্ত গ্রহণ করা উচিত।
জীবাণুমুক্ত সূঁচ ও সিরিঞ্জ ব্যবহার করুন।
ট্যাটু বা পিয়ার্সিং করানোর ক্ষেত্রে নিরাপদ ও জীবাণুমুক্ত যন্ত্রপাতি নিশ্চিত করুন।
হেপাটাইটিস A ও E প্রতিরোধে:
বিশুদ্ধ পানি পান করুন।
নিরাপদ খাবার গ্রহণ করুন।
সাবান দিয়ে নিয়মিত হাত ধুয়ে নিন।
সঠিক স্যানিটেশন নিশ্চিত করুন।
HBsAg পজিটিভ হলে নিজে সিদ্ধান্ত না নিয়ে দ্রুত লিভার বিশেষজ্ঞ বা গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্টের পরামর্শ নিন।
বারবার ALT (SGPT) বৃদ্ধি পেলে এর কারণ নির্ণয় এবং প্রয়োজনে চিকিৎসা জরুরি।
দীর্ঘদিন দুর্বলতা, জন্ডিস, অস্বাভাবিক লিভার রিপোর্ট বা লিভারের রোগের সন্দেহ থাকলে বিশেষজ্ঞের মূল্যায়ন প্রয়োজন।
এছাড়াও দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যান যদি:
পেট ফুলে যায়
বমিতে রক্ত আসে বা কালো পায়খানা হয়
অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব বা বিভ্রান্তি দেখা দেয়
অনেক প্রাপ্তবয়স্কের ক্ষেত্রে শরীর নিজেই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদি (Chronic) Hepatitis B-এর ক্ষেত্রে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।
হ্যাঁ। আধুনিক Direct-Acting Antiviral (DAA) ওষুধের মাধ্যমে অধিকাংশ রোগীর ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব।
হ্যাঁ। হেপাটাইটিস বি প্রতিরোধে এটি অত্যন্ত কার্যকর ও নিরাপদ একটি টিকা।
না। জন্ডিসের অনেক কারণ থাকতে পারে। কারণ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরীক্ষা করা জরুরি।
হ্যাঁ। নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং যথাযথ চিকিৎসার মাধ্যমে অনেক রোগী স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।
হেপাটাইটিস একটি প্রতিরোধযোগ্য এবং অনেক ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণযোগ্য রোগ। তাই ঝুঁকিতে থাকলে সময়মতো পরীক্ষা করুন, হেপাটাইটিস বি-এর টিকা গ্রহণ করুন এবং নিজে থেকে ওষুধ শুরু বা বন্ধ করবেন না। HBsAg পজিটিভ, লিভারের এনজাইম (ALT/SGPT) বারবার বেড়ে যাওয়া বা দীর্ঘদিন জন্ডিস থাকলে দ্রুত একজন লিভার বিশেষজ্ঞ (Hepatologist) বা গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্টের পরামর্শ নিন। দ্রুত রোগ নির্ণয় ও নিয়মিত ফলো-আপ লিভার সিরোসিস এবং লিভার ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
Content Source: Doctors24 Official YouTube Channel
Medical Expert Featured: ডা. সুস্মিতা ইসলাম, এমবিবিএস, এফসিপিএস (মেডিসিন),এমডি (গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি), এমএসিজি (মেম্বার অব আমেরিকান কলেজ অব গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি), সহকারী অধ্যাপক, গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (সাবেক পিজি হাসপাতাল), ঢাকা।
Content Prepared & Published By: Doctors24 Editorial Team
Last Updated: 31 July 2026 • Read Editorial Policy →
Connect with experienced gastroenterologist near you for consultation and treatment.
123 Doctors
13 Doctors
7 Doctors
11 Doctors
6 Doctors
4 Doctors