সাইনোসাইটিস (Sinusitis): কারণ, লক্ষণ, পরীক্ষা, চিকিৎসা ও প্রতিরোধ

Doctors24 Editorial TeamJuly 31, 2026
সাইনোসাইটিস (Sinusitis): কারণ, লক্ষণ, পরীক্ষা, চিকিৎসা ও প্রতিরোধ
Key Overview

"সাইনোসাইটিস (Sinusitis) বা রাইনোসাইনুসাইটিস (Rhinosinusitis) হলো নাকের চারপাশে থাকা বায়ুভর্তি গহ্বর (Paranasal Sinuses) এবং নাকের ভেতরের আস্তরণের প্রদাহ বা সংক..."

সাইনোসাইটিস (Sinusitis) বা রাইনোসাইনুসাইটিস (Rhinosinusitis) হলো নাকের চারপাশে থাকা বায়ুভর্তি গহ্বর (Paranasal Sinuses) এবং নাকের ভেতরের আস্তরণের প্রদাহ বা সংক্রমণ। এটি ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, অ্যালার্জি বা অন্যান্য কারণে হতে পারে। সাইনোসাইটিসের ফলে নাক বন্ধ থাকা, মুখে বা কপালে চাপ বা ব্যথা, ঘন নাকের সর্দি এবং ঘ্রাণশক্তি কমে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

অধিকাংশ তীব্র (Acute) সাইনোসাইটিস ভাইরাসজনিত এবং কয়েক সপ্তাহের মধ্যে নিজে থেকেই ভালো হয়ে যায়। তবে দীর্ঘস্থায়ী বা জটিল ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।


সাইনোসাইটিস (Sinusitis) কী?

সাইনাস হলো নাকের চারপাশে অবস্থিত বায়ুভর্তি চার জোড়া গহ্বর—

  • Maxillary Sinus

  • Frontal Sinus

  • Ethmoid Sinus

  • Sphenoid Sinus

যখন এই গহ্বরগুলোর মুখ বন্ধ হয়ে যায় এবং ভেতরে প্রদাহ বা সংক্রমণ হয়, তখন তাকে সাইনোসাইটিস বলা হয়।


সংক্ষেপে (Quick Facts)

বিষয়

তথ্য

চিকিৎসা নাম

Rhinosinusitis

সাধারণ নাম

Sinusitis

প্রধান কারণ

ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, অ্যালার্জি

সাধারণ উপসর্গ

নাক বন্ধ, মুখে ব্যথা বা চাপ, ঘন সর্দি

চিকিৎসা

উপসর্গভিত্তিক চিকিৎসা, প্রয়োজনে অ্যান্টিবায়োটিক

কোন বিশেষজ্ঞ দেখাবেন

নাক-কান-গলা (ENT) বিশেষজ্ঞ

🚨 কখন জরুরি চিকিৎসা নেবেন?

নিচের যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যান—

  • চোখ ফুলে যাওয়া বা চোখ নাড়াতে ব্যথা

  • দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা বা কমে যাওয়া

  • তীব্র মাথাব্যথা ও ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া

  • উচ্চ জ্বরের সঙ্গে তীব্র অসুস্থতা

  • বিভ্রান্তি বা অজ্ঞান হওয়া

  • মুখের একপাশে তীব্র ফোলা

এগুলো সাইনোসাইটিসের বিরল কিন্তু গুরুতর জটিলতার লক্ষণ হতে পারে।


সাইনোসাইটিসের ধরন

১. Acute Sinusitis

  • উপসর্গ ৪ সপ্তাহের কম স্থায়ী হয়।

  • বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভাইরাসজনিত।

২. Subacute Sinusitis

  • উপসর্গ ৪–১২ সপ্তাহ থাকে।

৩. Chronic Sinusitis

  • উপসর্গ ১২ সপ্তাহ বা তার বেশি স্থায়ী হয়।

৪. Recurrent Acute Sinusitis

  • বছরে ৪ বা তার বেশি তীব্র সাইনোসাইটিসের পর্ব হয় এবং প্রতিবারের মধ্যে রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ থাকেন।


সাইনোসাইটিসের কারণ

ভাইরাস

সবচেয়ে সাধারণ কারণ। সাধারণ সর্দি-কাশির পর অনেক সময় সাইনোসাইটিস হয়।

ব্যাকটেরিয়া

উপসর্গ দীর্ঘস্থায়ী হলে বা প্রথমে ভালো হয়ে আবার খারাপ হলে ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের সম্ভাবনা থাকে।

অ্যালার্জি

অ্যালার্জিক রাইনাইটিসের কারণে নাকের ভেতর ফুলে গেলে সাইনাসের মুখ বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

অন্যান্য কারণ

  • নাকের হাড় বাঁকা (Deviated Nasal Septum)

  • নাকের পলিপ (Nasal Polyps)

  • দাঁতের সংক্রমণ

  • ধূমপান

  • দূষিত পরিবেশ

  • দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা


ঝুঁকির কারণ

  • অ্যালার্জি

  • হাঁপানি (Asthma)

  • ধূমপান

  • নাকের পলিপ

  • নাকের হাড় বাঁকা

  • বারবার সর্দি হওয়া

  • দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা


লক্ষণ

সাধারণ লক্ষণগুলো হলো—

  • নাক বন্ধ থাকা

  • ঘন হলুদ বা সবুজ সর্দি

  • মুখে, গালে বা কপালে ব্যথা বা চাপ

  • মাথাব্যথা

  • ঘ্রাণশক্তি কমে যাওয়া

  • গলার পেছনে সর্দি পড়া (Postnasal Drip)

  • কাশি (বিশেষ করে রাতে)

  • মুখ থেকে দুর্গন্ধ

  • দাঁতে ব্যথা (বিশেষ করে উপরের দাঁত)


ভাইরাসজনিত ও ব্যাকটেরিয়াজনিত সাইনোসাইটিসের পার্থক্য

ব্যাকটেরিয়াজনিত সাইনোসাইটিসের সম্ভাবনা বেশি যদি—

  • উপসর্গ ১০ দিনের বেশি স্থায়ী হয় এবং উন্নতি না হয়।

  • প্রথমে ভালো হয়ে পরে আবার জ্বর ও ঘন সর্দি নিয়ে খারাপ হয় (Double Worsening)।

  • শুরু থেকেই উচ্চ জ্বর, মুখে তীব্র ব্যথা এবং ঘন পুঁজযুক্ত সর্দি থাকে।


কীভাবে রোগ নির্ণয় করা হয়?

চিকিৎসকের মূল্যায়ন

  • রোগের ইতিহাস

  • উপসর্গের সময়কাল

  • নাক ও গলার পরীক্ষা

প্রয়োজনীয় পরীক্ষা

অধিকাংশ ক্ষেত্রে অতিরিক্ত পরীক্ষার প্রয়োজন হয় না।

জটিল বা দীর্ঘস্থায়ী ক্ষেত্রে করা হতে পারে—

  • Nasal Endoscopy

  • CT Scan of Paranasal Sinuses

  • Allergy Test (নির্বাচিত ক্ষেত্রে)

  • Nasal Culture (বিশেষ পরিস্থিতিতে)


সাইনোসাইটিসের চিকিৎসা

চিকিৎসা রোগের কারণ ও তীব্রতার ওপর নির্ভর করে।

১. উপসর্গভিত্তিক চিকিৎসা

  • Paracetamol বা অন্যান্য উপযুক্ত ব্যথানাশক

  • পর্যাপ্ত পানি পান

  • বিশ্রাম

২. Saline Nasal Irrigation

লবণপানির নাক ধোয়া নাক পরিষ্কার রাখতে ও উপসর্গ কমাতে সহায়ক।

৩. Intranasal Corticosteroid Spray

বিশেষ করে অ্যালার্জি বা দীর্ঘস্থায়ী সাইনোসাইটিসে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবহার করা হয়।

৪. অ্যান্টিবায়োটিক

সব সাইনোসাইটিসে অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজন হয় না।

ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের দৃঢ় সন্দেহ থাকলে চিকিৎসক উপযুক্ত অ্যান্টিবায়োটিক দিতে পারেন।

৫. অ্যালার্জির চিকিৎসা

প্রয়োজনে অ্যান্টিহিস্টামিন বা অন্যান্য অ্যালার্জির ওষুধ ব্যবহার করা হতে পারে।

৬. অস্ত্রোপচার

যদি দীর্ঘদিন ওষুধে উপকার না হয় অথবা নাকের পলিপ, নাকের হাড় বাঁকা বা অন্য কাঠামোগত সমস্যা থাকে, তাহলে Functional Endoscopic Sinus Surgery (FESS) বিবেচনা করা হতে পারে।


বাসায় কী করবেন?

  • পর্যাপ্ত পানি পান করুন।

  • লবণপানির নাক ধোয়া (Saline Irrigation) ব্যবহার করুন।

  • ধূমপান ও ধোঁয়া এড়িয়ে চলুন।

  • পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন।

  • ঘরের বাতাস আর্দ্র রাখার চেষ্টা করুন।

  • অ্যালার্জির কারণগুলো এড়িয়ে চলুন।


সম্ভাব্য জটিলতা

যদিও বিরল, চিকিৎসা না করলে হতে পারে—

  • চোখের সংক্রমণ (Orbital Cellulitis)

  • চোখের চারপাশে ফোঁড়া

  • মেনিনজাইটিস

  • মস্তিষ্কে ফোঁড়া (Brain Abscess)

  • দীর্ঘস্থায়ী সাইনোসাইটিস


প্রতিরোধের উপায়

  • নিয়মিত হাত ধুয়ে নিন।

  • সর্দি-কাশি হলে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন।

  • অ্যালার্জি নিয়ন্ত্রণে রাখুন।

  • ধূমপান পরিহার করুন।

  • দূষিত পরিবেশে মাস্ক ব্যবহার করুন।

  • প্রয়োজনীয় টিকা (যেমন ইনফ্লুয়েঞ্জা) গ্রহণ করুন।


কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?

ENT বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন যদি—

  • উপসর্গ ১০ দিনের বেশি থাকে।

  • বারবার সাইনোসাইটিস হয়।

  • ১২ সপ্তাহের বেশি উপসর্গ থাকে।

  • চোখ ফুলে যায় বা দৃষ্টিশক্তির সমস্যা হয়।

  • উচ্চ জ্বর বা তীব্র মুখের ব্যথা থাকে।


প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

সব সাইনোসাইটিসে কি অ্যান্টিবায়োটিক লাগে?

না। অধিকাংশ তীব্র সাইনোসাইটিস ভাইরাসজনিত এবং অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজন হয় না।

সাইনোসাইটিস কি ছোঁয়াচে?

সাইনোসাইটিস নিজে ছোঁয়াচে নয়। তবে যেসব ভাইরাস থেকে এটি হয়, সেগুলো অন্যদের মধ্যে ছড়াতে পারে।

সাইনোসাইটিসে কি মাথাব্যথা হয়?

হ্যাঁ। বিশেষ করে কপাল, গাল বা চোখের চারপাশে চাপ বা ব্যথা অনুভূত হতে পারে।

দীর্ঘদিন সাইনোসাইটিস থাকলে কি অপারেশন লাগে?

সবসময় নয়। ওষুধে উপকার না হলে বা নাকের পলিপ বা গঠনগত সমস্যা থাকলে FESS বিবেচনা করা হতে পারে।

লবণপানির নাক ধোয়া কি উপকারী?

হ্যাঁ। Saline Nasal Irrigation নাক পরিষ্কার রাখতে এবং উপসর্গ কমাতে কার্যকর ও নিরাপদ একটি পদ্ধতি।


মূল বিষয়গুলো (Key Takeaways)

  • সাইনোসাইটিস হলো সাইনাসের প্রদাহ বা সংক্রমণ।

  • অধিকাংশ তীব্র সাইনোসাইটিস ভাইরাসজনিত এবং নিজে থেকেই ভালো হয়ে যায়।

  • নাক বন্ধ, মুখে চাপ বা ব্যথা এবং ঘন সর্দি প্রধান লক্ষণ।

  • সব রোগীর অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজন হয় না।

  • দীর্ঘস্থায়ী বা বারবার সাইনোসাইটিস হলে ENT বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।


তথ্যসূত্র

  • American Academy of Otolaryngology–Head and Neck Surgery (AAO-HNS)

  • European Position Paper on Rhinosinusitis and Nasal Polyps (EPOS)

  • Infectious Diseases Society of America (IDSA)

  • National Institute for Health and Care Excellence (NICE)

  • World Health Organization (WHO)


Medical Review

গুরুত্বপূর্ণ: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র স্বাস্থ্যশিক্ষার উদ্দেশ্যে প্রস্তুত করা হয়েছে। এটি ব্যক্তিগত চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়। আপনার যদি ১০ দিনের বেশি নাক বন্ধ, মুখে ব্যথা, ঘন সর্দি, বারবার সাইনোসাইটিস বা ১২ সপ্তাহের বেশি উপসর্গ থাকে, তাহলে একজন নাক-কান-গলা (ENT) বিশেষজ্ঞ-এর পরামর্শ নিন। চোখ ফুলে যাওয়া, দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া, তীব্র মাথাব্যথা বা বিভ্রান্তি দেখা দিলে অবিলম্বে জরুরি চিকিৎসা গ্রহণ করুন।

এই নিবন্ধটি AAO-HNS, EPOS, IDSA, NICE এবং WHO-এর সর্বশেষ আন্তর্জাতিক ক্লিনিক্যাল নির্দেশিকার ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে এবং নির্ভুল, প্রমাণভিত্তিক ও হালনাগাদ চিকিৎসা তথ্য নিশ্চিত করতে নিয়মিত পর্যালোচনা করা হয়।

Content prepared by: Doctors24 Editorial Team

Medical information is verified using registered doctor data and trusted healthcare sources

Information sources: Public records, hospital data, and provided credentials

Published At: July 31, 2026

Last updated: July 31, 2026 Read Editorial Policy →

Related ENT Specialist Articles

View all →

Related ENT Specialist Videos

View all →