টনসিলের সমস্যা (Tonsillitis): কারণ, লক্ষণ, চিকিৎসা ও কখন অপারেশন প্রয়োজন

"টনসিলের প্রদাহ (Tonsillitis) হলো গলার দুই পাশে অবস্থিত টনসিল (Palatine Tonsils)-এর সংক্রমণ বা প্রদাহ। এটি শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা গেলেও যেকোনো বয়সেই হতে পারে।..."
টনসিলের প্রদাহ (Tonsillitis) হলো গলার দুই পাশে অবস্থিত টনসিল (Palatine Tonsils)-এর সংক্রমণ বা প্রদাহ। এটি শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা গেলেও যেকোনো বয়সেই হতে পারে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভাইরাসের কারণে হলেও কিছু ক্ষেত্রে ব্যাকটেরিয়া, বিশেষ করে Group A Streptococcus (Streptococcus pyogenes) সংক্রমণের কারণে টনসিলে প্রদাহ হয়।
টনসিলের প্রদাহে সাধারণত গলা ব্যথা, গিলতে কষ্ট, জ্বর, টনসিল ফুলে যাওয়া এবং ঘাড়ের লিম্ফ নোড বড় হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দেয়। অধিকাংশ রোগী বিশ্রাম ও উপযুক্ত চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে ওঠেন। তবে বারবার সংক্রমণ, শ্বাসকষ্ট বা জটিলতা হলে টনসিল অপারেশন (Tonsillectomy) প্রয়োজন হতে পারে।
টনসিল (Tonsils) কী?
টনসিল হলো গলার পেছনে দুই পাশে থাকা লিম্ফয়েড টিস্যু, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার (Immune System) একটি অংশ। শিশুদের ক্ষেত্রে এগুলো জীবাণুর বিরুদ্ধে প্রাথমিক প্রতিরক্ষা হিসেবে কাজ করে।
যখন ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ হয়, তখন টনসিল ফুলে যায় এবং প্রদাহ সৃষ্টি হয়।
সংক্ষেপে (Quick Facts)
বিষয় | তথ্য |
|---|---|
চিকিৎসা নাম | Tonsillitis |
প্রধান কারণ | ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ |
সাধারণ লক্ষণ | গলা ব্যথা, জ্বর, গিলতে কষ্ট |
গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা | শারীরিক পরীক্ষা; প্রয়োজনে Rapid Strep Test বা Throat Culture |
কোন বিশেষজ্ঞ দেখাবেন | নাক-কান-গলা (ENT) বিশেষজ্ঞ |
🚨 কখন জরুরি চিকিৎসা নেবেন?
নিচের যেকোনো লক্ষণ থাকলে দ্রুত হাসপাতালে যান—
শ্বাস নিতে কষ্ট
মুখ খুলতে অসুবিধা (Trismus)
অতিরিক্ত লালা পড়া বা গিলতে একেবারেই না পারা
একপাশে গলা ফুলে যাওয়া ও তীব্র ব্যথা
উচ্চ জ্বরের সঙ্গে অবসন্নতা
শিশু খাওয়া বা পানি পান করতে না পারা
এগুলো Peritonsillar Abscess, Airway Obstruction বা গুরুতর সংক্রমণের লক্ষণ হতে পারে।
টনসিলের প্রদাহের কারণ
১. ভাইরাসজনিত সংক্রমণ (সবচেয়ে সাধারণ)
যেমন—
Adenovirus
Rhinovirus
Influenza Virus
Epstein-Barr Virus (EBV)
Coronavirus-এর কিছু ধরন
২. ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ
সবচেয়ে সাধারণ—
Group A Streptococcus (Strep Throat)
অন্যান্য ব্যাকটেরিয়াও দায়ী হতে পারে।
ঝুঁকির কারণ
স্কুলগামী শিশু
সংক্রমিত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া
ধূমপানের ধোঁয়ার সংস্পর্শ
বারবার শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ
লক্ষণ
সাধারণ লক্ষণ
তীব্র গলা ব্যথা
গিলতে কষ্ট
জ্বর
টনসিল ফুলে যাওয়া
টনসিলে সাদা বা হলুদ আবরণ (Pus)
মুখে দুর্গন্ধ
ঘাড়ের লিম্ফ নোড ফুলে যাওয়া
কণ্ঠস্বর পরিবর্তন
মাথাব্যথা
দুর্বলতা
শিশুদের ক্ষেত্রে
খেতে না চাওয়া
অতিরিক্ত কান্না
লালা পড়া
বমি হতে পারে
ভাইরাল ও ব্যাকটেরিয়াল টনসিলাইটিসের পার্থক্য
ভাইরাল | ব্যাকটেরিয়াল |
|---|---|
কাশি ও সর্দি থাকতে পারে | সাধারণত কাশি থাকে না |
ধীরে শুরু হয় | হঠাৎ শুরু হয় |
জ্বর কম বা মাঝারি | উচ্চ জ্বর হতে পারে |
অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন হয় না | নিশ্চিত হলে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন হতে পারে |
শুধুমাত্র উপসর্গ দেখে নিশ্চিতভাবে ভাইরাল বা ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ নির্ণয় করা যায় না। প্রয়োজনে চিকিৎসক পরীক্ষা করার পর সিদ্ধান্ত নেন।
কীভাবে রোগ নির্ণয় করা হয়?
চিকিৎসকের মূল্যায়ন
গলা পরীক্ষা
টনসিলের অবস্থা
জ্বর
লিম্ফ নোড পরীক্ষা
প্রয়োজনীয় পরীক্ষা
Rapid Strep Test
Throat Culture (প্রয়োজনে)
Complete Blood Count (CBC)
Mononucleosis Test (নির্বাচিত ক্ষেত্রে)
টনসিলের চিকিৎসা
চিকিৎসা সংক্রমণের কারণের ওপর নির্ভর করে।
১. ভাইরাল Tonsillitis
অধিকাংশ ক্ষেত্রে—
বিশ্রাম
পর্যাপ্ত পানি পান
গরম লবণ পানিতে গার্গল
ব্যথা ও জ্বরের জন্য Paracetamol বা Ibuprofen (চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী)
২. ব্যাকটেরিয়াল Tonsillitis
যদি Group A Streptococcus নিশ্চিত বা অত্যন্ত সন্দেহজনক হয়, তাহলে চিকিৎসক উপযুক্ত অ্যান্টিবায়োটিক দিতে পারেন।
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করবেন না এবং মাঝপথে বন্ধ করবেন না।
কখন টনসিল অপারেশন (Tonsillectomy) প্রয়োজন?
সব টনসিলের সমস্যায় অপারেশন লাগে না।
নিম্নলিখিত ক্ষেত্রে ENT বিশেষজ্ঞ অপারেশন বিবেচনা করতে পারেন—
১. বারবার টনসিলের সংক্রমণ (Recurrent Tonsillitis)
আন্তর্জাতিকভাবে বহুল ব্যবহৃত Paradise Criteria অনুযায়ী—
গত ১ বছরে ৭ বা তার বেশি নিশ্চিত সংক্রমণ, অথবা
পরপর ২ বছরে প্রতি বছরে ৫ বা তার বেশি, অথবা
পরপর ৩ বছরে প্রতি বছরে ৩ বা তার বেশি সংক্রমণ।
২. Peritonsillar Abscess
বিশেষ করে বারবার হলে।
৩. Obstructive Sleep Apnea (OSA)
বড় টনসিলের কারণে ঘুমের সময় শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়া, নাক ডাকা বা শ্বাসকষ্ট হলে।
৪. গিলতে গুরুতর সমস্যা
৫. টনসিলে ক্যান্সারের সন্দেহ
বিশেষ করে একপাশের টনসিল অস্বাভাবিকভাবে বড় হলে।
টনসিল অপারেশন কীভাবে করা হয়?
Tonsillectomy সাধারণত General Anesthesia-এর মাধ্যমে করা হয়।
অপারেশনে—
উভয় টনসিল সম্পূর্ণ অপসারণ করা হয়।
সাধারণত ৩০–৬০ মিনিট সময় লাগে।
অধিকাংশ রোগী একই দিন বা পরদিন বাড়ি যেতে পারেন।
অপারেশনের পর যত্ন
পর্যাপ্ত তরল পান করুন।
নরম ও ঠান্ডা খাবার খান।
চিকিৎসকের নির্দেশ অনুযায়ী ব্যথার ওষুধ গ্রহণ করুন।
কয়েকদিন ভারী কাজ এড়িয়ে চলুন।
পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন।
অপারেশনের পর জরুরি লক্ষণ
অবিলম্বে হাসপাতালে যান যদি—
মুখ দিয়ে রক্ত পড়ে
শ্বাসকষ্ট হয়
উচ্চ জ্বর হয়
পানি পান করতে না পারেন
সম্ভাব্য জটিলতা
চিকিৎসা না করলে হতে পারে—
Peritonsillar Abscess
গিলতে গুরুতর সমস্যা
ডিহাইড্রেশন
মধ্যকর্ণের সংক্রমণ
বিরল ক্ষেত্রে Rheumatic Fever (অচিকিৎসিত Streptococcal সংক্রমণে)
Post-streptococcal Glomerulonephritis (বিরল)
প্রতিরোধের উপায়
নিয়মিত হাত ধুয়ে নিন।
অসুস্থ ব্যক্তির সঙ্গে খাবার বা পানীয় ভাগাভাগি করবেন না।
কাশি বা হাঁচির সময় মুখ ঢাকুন।
ধূমপান ও ধূমপানের ধোঁয়া এড়িয়ে চলুন।
পর্যাপ্ত ঘুম ও সুষম খাদ্য গ্রহণ করুন।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন যদি—
গলা ব্যথা ৩–৫ দিনের বেশি থাকে
উচ্চ জ্বর হয়
গিলতে কষ্ট বাড়ে
বারবার টনসিলে সংক্রমণ হয়
শ্বাসকষ্ট বা ঘুমের সময় শ্বাস বন্ধ হওয়ার লক্ষণ থাকে
প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
টনসিল কি নিজে থেকেই ভালো হয়ে যায়?
অনেক ভাইরাল টনসিলাইটিস ৫–৭ দিনের মধ্যে নিজে থেকেই ভালো হয়ে যায়। তবে ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন হতে পারে।
সব টনসিলের সমস্যায় কি অ্যান্টিবায়োটিক লাগে?
না। অধিকাংশ Tonsillitis ভাইরাসজনিত, যেখানে অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকর নয়।
টনসিল অপারেশন করলে কি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়?
না। গবেষণায় দেখা গেছে, টনসিল অপসারণের পর অধিকাংশ মানুষের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদে উল্লেখযোগ্য নেতিবাচক প্রভাব পড়ে না।
টনসিল আবার গজায় কি?
সম্পূর্ণ Tonsillectomy-এর পর সাধারণত টনসিল পুনরায় গজায় না। খুব বিরল ক্ষেত্রে সামান্য টিস্যু অবশিষ্ট থাকলে কিছুটা বৃদ্ধি পেতে পারে।
অপারেশনের পর কত দিনে সুস্থ হওয়া যায়?
বেশিরভাগ রোগী ১০–১৪ দিনের মধ্যে স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরতে পারেন, যদিও ব্যথা ধীরে ধীরে কমে।
মূল বিষয়গুলো (Key Takeaways)
টনসিলাইটিসের প্রধান কারণ ভাইরাস; কিছু ক্ষেত্রে ব্যাকটেরিয়া দায়ী।
গলা ব্যথা, জ্বর ও গিলতে কষ্ট প্রধান লক্ষণ।
নিশ্চিত ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ হলে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন হতে পারে।
বারবার সংক্রমণ, Sleep Apnea বা Peritonsillar Abscess হলে Tonsillectomy বিবেচনা করা হয়।
অপারেশনের পর মুখ দিয়ে রক্ত পড়া একটি জরুরি অবস্থা এবং দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে।
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করা উচিত নয়।
তথ্যসূত্র
American Academy of Otolaryngology–Head and Neck Surgery (AAO-HNS). Clinical Practice Guideline: Tonsillectomy in Children
National Institute for Health and Care Excellence (NICE)
Infectious Diseases Society of America (IDSA). Guideline for Group A Streptococcal Pharyngitis
Centers for Disease Control and Prevention (CDC)
World Health Organization (WHO)
Medical Review
গুরুত্বপূর্ণ: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র স্বাস্থ্যশিক্ষার উদ্দেশ্যে প্রস্তুত করা হয়েছে। এটি ব্যক্তিগত চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়। আপনার বা আপনার সন্তানের যদি তীব্র গলা ব্যথা, উচ্চ জ্বর, গিলতে কষ্ট, শ্বাসকষ্ট, বারবার টনসিলের সংক্রমণ বা টনসিলে পুঁজ দেখা যায়, তাহলে দ্রুত একজন নাক-কান-গলা (ENT) বিশেষজ্ঞ-এর পরামর্শ নিন। শ্বাস নিতে কষ্ট, মুখ দিয়ে রক্ত পড়া বা গিলতে একেবারেই না পারলে অবিলম্বে নিকটস্থ হাসপাতালে জরুরি চিকিৎসা গ্রহণ করুন।
এই নিবন্ধটি American Academy of Otolaryngology–Head and Neck Surgery (AAO-HNS), IDSA, NICE, CDC এবং WHO-এর সর্বশেষ আন্তর্জাতিক ক্লিনিক্যাল নির্দেশিকার ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে এবং নির্ভুল, প্রমাণভিত্তিক ও হালনাগাদ চিকিৎসা তথ্য নিশ্চিত করতে নিয়মিত পর্যালোচনা করা হয়।
Content prepared by: Doctors24 Editorial Team
Medical information is verified using registered doctor data and trusted healthcare sources
Information sources: Public records, hospital data, and provided credentials
Published At: July 30, 2026
Last updated: July 30, 2026 • Read Editorial Policy →
Find ENT Specialist in Your Area
Connect with experienced ent specialist near you for consultation and treatment.
