নবজাতকের জন্ডিস: কারণ, লক্ষণ, চিকিৎসা ও কখন হাসপাতালে যাবেন

Doctors24 Editorial TeamJuly 29, 2026
নবজাতকের জন্ডিস: কারণ, লক্ষণ, চিকিৎসা ও কখন হাসপাতালে যাবেন
Key Overview

"নবজাতকের জন্ডিস (Neonatal Jaundice) হলো জন্মের পর শিশুর ত্বক ও চোখের সাদা অংশ হলুদ হয়ে যাওয়া। এটি নবজাতকদের মধ্যে অত্যন্ত সাধারণ একটি অবস্থা। জন্মের প্রথম সপ্..."

নবজাতকের জন্ডিস (Neonatal Jaundice) হলো জন্মের পর শিশুর ত্বক ও চোখের সাদা অংশ হলুদ হয়ে যাওয়া। এটি নবজাতকদের মধ্যে অত্যন্ত সাধারণ একটি অবস্থা। জন্মের প্রথম সপ্তাহে প্রায় ৫০–৬০% পূর্ণমেয়াদি (Term) এবং ৮০% পর্যন্ত অপরিণত (Preterm) শিশুর জন্ডিস দেখা দিতে পারে।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটি ফিজিওলজিক জন্ডিস (Physiological Jaundice), যা স্বাভাবিক এবং কয়েক দিনের মধ্যে নিজে থেকেই সেরে যায়। তবে কিছু ক্ষেত্রে রক্তে বিলিরুবিন (Bilirubin)-এর মাত্রা অতিরিক্ত বেড়ে গেলে মস্তিষ্কের ক্ষতি (Kernicterus)সহ গুরুতর জটিলতা হতে পারে। তাই নবজাতকের জন্ডিসকে কখনোই অবহেলা করা উচিত নয়।

সঠিক সময়ে মূল্যায়ন, প্রয়োজন হলে ফোটোথেরাপি (Phototherapy) বা এক্সচেঞ্জ ট্রান্সফিউশন (Exchange Transfusion)-এর মাধ্যমে অধিকাংশ শিশুই সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠে।


নবজাতকের জন্ডিস কী?

নবজাতকের জন্ডিস (Neonatal Jaundice) হলো এমন একটি অবস্থা, যেখানে রক্তে বিলিরুবিনের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার কারণে শিশুর ত্বক, চোখের সাদা অংশ এবং কখনও কখনও শরীরের অন্যান্য অংশ হলুদ দেখায়।

বিলিরুবিন হলো লোহিত রক্তকণিকা ভেঙে তৈরি হওয়া একটি হলুদ রঞ্জক পদার্থ। নবজাতকের লিভার পুরোপুরি পরিপক্ব না হওয়ায় প্রথম কয়েক দিনে বিলিরুবিন শরীর থেকে ধীরে বের হয়, ফলে জন্ডিস দেখা দিতে পারে।


সংক্ষেপে (Quick Facts)

বিষয়

তথ্য

চিকিৎসা নাম

Neonatal Jaundice

প্রধান কারণ

রক্তে বিলিরুবিন বেড়ে যাওয়া

এটি কি সাধারণ?

হ্যাঁ, নবজাতকের মধ্যে খুবই সাধারণ

প্রধান চিকিৎসা

পর্যবেক্ষণ, ফোটোথেরাপি, প্রয়োজনে এক্সচেঞ্জ ট্রান্সফিউশন

কোন বিশেষজ্ঞ দেখাবেন

নবজাতক বিশেষজ্ঞ (Neonatologist) বা শিশু বিশেষজ্ঞ (Pediatrician)

🚨 জরুরি সতর্কতা

নিচের যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলে শিশুকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যান—

  • জন্মের প্রথম ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জন্ডিস শুরু হওয়া

  • জন্ডিস দ্রুত বাড়তে থাকা

  • শিশু ঠিকমতো দুধ না খাওয়া

  • অতিরিক্ত ঘুমিয়ে থাকা বা জাগানো কঠিন হওয়া

  • তীব্র কান্না বা অস্বাভাবিক নিস্তেজতা

  • খিঁচুনি

  • শরীর শক্ত হয়ে যাওয়া বা ঢিলে হয়ে যাওয়া

  • জ্বর বা শ্বাসকষ্ট


নবজাতকের জন্ডিসের লক্ষণ

  • চোখের সাদা অংশ হলুদ হওয়া

  • মুখ থেকে শুরু করে বুক, পেট, হাত ও পা পর্যন্ত হলুদ রঙ ছড়িয়ে পড়া

  • অতিরিক্ত ঘুমানো

  • দুধ কম খাওয়া

  • দুর্বল বা নিস্তেজ থাকা

  • ওজন কমে যাওয়া (কিছু ক্ষেত্রে)

গুরুতর ক্ষেত্রে—

  • খিঁচুনি

  • উচ্চস্বরে কান্না

  • শরীর বাঁকা হয়ে যাওয়া (Opisthotonus)

  • মস্তিষ্কে বিলিরুবিনের প্রভাবের লক্ষণ


নবজাতকের জন্ডিসের কারণ

১. ফিজিওলজিক জন্ডিস (Physiological Jaundice)

  • সবচেয়ে সাধারণ

  • সাধারণত জন্মের ২৪ ঘণ্টা পরে শুরু হয়

  • ৩–৫ দিনে সর্বোচ্চ হয়

  • ১–২ সপ্তাহের মধ্যে কমে যায়

২. বুকের দুধ-সম্পর্কিত জন্ডিস

Breastfeeding Jaundice

  • পর্যাপ্ত দুধ না পেলে হতে পারে

  • সাধারণত জীবনের প্রথম সপ্তাহে দেখা যায়

Breast Milk Jaundice

  • কিছু শিশুর ক্ষেত্রে বুকের দুধের নির্দিষ্ট উপাদানের কারণে বিলিরুবিন দীর্ঘদিন কিছুটা বেশি থাকতে পারে

  • শিশুর অবস্থা সাধারণত ভালো থাকে

৩. রক্তের গ্রুপের অমিল

  • ABO Incompatibility

  • Rh Incompatibility

৪. সংক্রমণ (Sepsis)

৫. অপরিণত (Preterm) শিশু

৬. জন্মের সময় রক্তক্ষরণ বা মাথায় ফোলা (Cephalohematoma)

৭. বিরল কারণ

  • G6PD Deficiency

  • জন্মগত লিভারের রোগ

  • জন্মগত হাইপোথাইরয়েডিজম

  • কিছু বংশগত রক্তের রোগ


ঝুঁকির কারণ

  • প্রিম্যাচিউর জন্ম

  • কম ওজনের শিশু

  • রক্তের গ্রুপের অমিল

  • আগের সন্তানের তীব্র জন্ডিসের ইতিহাস

  • পর্যাপ্ত বুকের দুধ না পাওয়া

  • জন্মের সময় আঘাত


কীভাবে রোগ নির্ণয় করা হয়?

চিকিৎসকের মূল্যায়ন

  • শিশুর বয়স (ঘণ্টা অনুযায়ী)

  • জন্ডিস কখন শুরু হয়েছে

  • দুধ খাওয়ার ইতিহাস

  • প্রস্রাব ও পায়খানার পরিমাণ

  • ওজন

শারীরিক পরীক্ষা

  • ত্বক ও চোখ পরীক্ষা

  • স্নায়বিক লক্ষণ মূল্যায়ন

  • পানিশূন্যতা আছে কি না দেখা


প্রয়োজনীয় পরীক্ষা

পরীক্ষা

উদ্দেশ্য

Total Serum Bilirubin (TSB)

বিলিরুবিনের মাত্রা নির্ণয়

Transcutaneous Bilirubin (TcB)

ত্বকের মাধ্যমে বিলিরুবিন মূল্যায়ন

Blood Group ও Direct Coombs Test

রক্তের গ্রুপের অমিল শনাক্ত

CBC

সংক্রমণ বা রক্তের সমস্যা মূল্যায়ন

Reticulocyte Count

অতিরিক্ত রক্ত ভাঙছে কি না

G6PD Test

নির্বাচিত ক্ষেত্রে

Liver Function Test

দীর্ঘস্থায়ী জন্ডিসে

Thyroid Function Test

প্রয়োজন অনুযায়ী


নবজাতকের জন্ডিসের চিকিৎসা

চিকিৎসা নির্ভর করে—

  • শিশুর বয়স (ঘণ্টা)

  • বিলিরুবিনের মাত্রা

  • শিশুর ওজন

  • প্রিম্যাচিউর কি না

  • অন্যান্য ঝুঁকির কারণ


১. পর্যবেক্ষণ

হালকা ফিজিওলজিক জন্ডিসে—

  • নিয়মিত পর্যবেক্ষণ

  • পর্যাপ্ত বুকের দুধ

  • প্রয়োজনে পুনরায় বিলিরুবিন পরীক্ষা


২. ফোটোথেরাপি (Phototherapy)

এটি সবচেয়ে প্রচলিত ও কার্যকর চিকিৎসা।

বিশেষ নীল আলোর মাধ্যমে বিলিরুবিনকে এমন রূপে পরিবর্তন করা হয়, যা সহজে শরীর থেকে বের হয়ে যায়।

ফোটোথেরাপির সময়—

  • শিশুর চোখ সুরক্ষিত রাখা হয়।

  • নিয়মিত দুধ খাওয়ানো হয়।

  • পর্যাপ্ত তরল নিশ্চিত করা হয়।

  • বিলিরুবিনের মাত্রা পর্যবেক্ষণ করা হয়।


৩. এক্সচেঞ্জ ট্রান্সফিউশন (Exchange Transfusion)

যদি বিলিরুবিন খুব বেশি বেড়ে যায় অথবা ফোটোথেরাপি যথেষ্ট কার্যকর না হয়, তাহলে বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে এই চিকিৎসা করা হয়।


৪. মূল কারণের চিকিৎসা

যদি জন্ডিসের কারণ হয়—

  • সংক্রমণ

  • Rh বা ABO Incompatibility

  • G6PD Deficiency

  • অন্য কোনো রোগ

তাহলে সেই কারণ অনুযায়ী চিকিৎসা করা হয়।


ঘরে কী করবেন?

  • শিশুকে ঘন ঘন বুকের দুধ খাওয়ান (প্রতিদিন ৮–১২ বার)।

  • চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ফলো-আপ করুন।

  • শিশুর প্রস্রাব ও পায়খানা পর্যবেক্ষণ করুন।

  • জন্ডিস বাড়ছে কি না খেয়াল করুন।

  • নিজে থেকে কোনো ওষুধ বা ভেষজ চিকিৎসা দেবেন না।

গুরুত্বপূর্ণ: শুধুমাত্র রোদে রাখলে নবজাতকের জন্ডিসের নিরাপদ ও কার্যকর চিকিৎসা হয় না। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এটি চিকিৎসার বিকল্প নয়।


কখন হাসপাতালে যাবেন?

অবিলম্বে হাসপাতালে যান যদি—

  • জন্মের প্রথম ২৪ ঘণ্টায় জন্ডিস শুরু হয়।

  • জন্ডিস দ্রুত বাড়ে।

  • শিশু দুধ না খায়।

  • অতিরিক্ত ঘুমিয়ে থাকে।

  • খিঁচুনি হয়।

  • জ্বর আসে।

  • শ্বাসকষ্ট হয়।

  • শিশুর শরীর ঢিলে বা শক্ত হয়ে যায়।


সম্ভাব্য জটিলতা

চিকিৎসা না করলে গুরুতর ক্ষেত্রে হতে পারে—

  • Acute Bilirubin Encephalopathy

  • Kernicterus

  • স্থায়ী শ্রবণশক্তি হ্রাস

  • মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতি

  • বিকাশগত সমস্যা

  • সেরিব্রাল পালসি (কিছু ক্ষেত্রে)


প্রতিরোধের উপায়

  • জন্মের পর যত দ্রুত সম্ভব বুকের দুধ শুরু করুন।

  • প্রথম কয়েক দিনে শিশুর জন্ডিস পর্যবেক্ষণ করুন।

  • নির্ধারিত সময়ে নবজাতকের ফলো-আপ করুন।

  • উচ্চ-ঝুঁকির শিশুর বিলিরুবিন পরীক্ষা করুন।

  • Rh-negative মায়েদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী Anti-D Immunoglobulin গ্রহণ করুন।


প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

নবজাতকের জন্ডিস কি সবসময় বিপজ্জনক?

না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি স্বাভাবিক এবং কয়েক দিনের মধ্যে সেরে যায়। তবে গুরুতর জন্ডিস দ্রুত চিকিৎসা না করলে বিপজ্জনক হতে পারে।

ফোটোথেরাপি কি নিরাপদ?

হ্যাঁ। এটি বহু বছর ধরে ব্যবহৃত একটি নিরাপদ ও কার্যকর চিকিৎসা। চিকিৎসাকালীন শিশুকে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয়।

বুকের দুধ কি বন্ধ করতে হবে?

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে না। বরং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত বুকের দুধ চালিয়ে যাওয়া উচিত।

জন্ডিস হলে কি শিশুকে রোদে রাখলেই হবে?

না। সূর্যের আলো ফোটোথেরাপির বিকল্প নয় এবং এতে চিকিৎসা বিলম্বিত হতে পারে।

জন্ডিস কি আবার হতে পারে?

কিছু শিশুর ক্ষেত্রে বিলিরুবিন আবার কিছুটা বাড়তে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ফলো-আপ করা জরুরি।


মূল বিষয়গুলো (Key Takeaways)

  • নবজাতকের জন্ডিস খুবই সাধারণ, তবে সব ক্ষেত্রে এটি নিরীহ নয়।

  • জন্মের প্রথম ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জন্ডিস শুরু হলে এটি জরুরি অবস্থা হিসেবে মূল্যায়ন করা উচিত।

  • Total Serum Bilirubin এবং শিশুর বয়স অনুযায়ী চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

  • Phototherapy হলো অধিকাংশ লক্ষণযুক্ত শিশুর প্রধান চিকিৎসা।

  • শিশুর দুধ কম খাওয়া, অতিরিক্ত ঘুম, খিঁচুনি বা জন্ডিস দ্রুত বাড়লে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।


তথ্যসূত্র

  • World Health Organization (WHO)

  • American Academy of Pediatrics (AAP)

  • National Institute for Health and Care Excellence (NICE)

  • Canadian Paediatric Society (CPS)

  • UNICEF – Newborn Health Guidelines


Medical Review

গুরুত্বপূর্ণ: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র স্বাস্থ্যশিক্ষার উদ্দেশ্যে প্রস্তুত করা হয়েছে। এটি ব্যক্তিগত চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়। নবজাতকের জন্ডিস দেখা দিলে শিশুকে নিজে থেকে চিকিৎসা না করে দ্রুত একজন নবজাতক বিশেষজ্ঞ (Neonatologist) বা শিশু বিশেষজ্ঞ (Pediatrician)-এর পরামর্শ নিন। বিশেষ করে জন্মের প্রথম ২৪ ঘণ্টায় জন্ডিস, দুধ না খাওয়া, অতিরিক্ত ঘুম, জ্বর বা খিঁচুনি থাকলে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন।

এই নিবন্ধটি WHO, American Academy of Pediatrics (AAP), NICE এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক নির্দেশিকার ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে এবং নির্ভুল, নির্ভরযোগ্য ও হালনাগাদ স্বাস্থ্যতথ্য নিশ্চিত করতে নিয়মিত পর্যালোচনা করা হয়।

Content prepared by: Doctors24 Editorial Team

Medical information is verified using registered doctor data and trusted healthcare sources

Information sources: Public records, hospital data, and provided credentials

Published At: July 29, 2026

Last updated: July 29, 2026 Read Editorial Policy →

Related Child Specialist Articles

View all →