শিশুর জ্বর: কারণ, লক্ষণ, চিকিৎসা ও কখন জরুরি চিকিৎসা নেবেন

Doctors24 Editorial TeamJuly 28, 2026
শিশুর জ্বর: কারণ, লক্ষণ, চিকিৎসা ও কখন জরুরি চিকিৎসা নেবেন
Key Overview

"শিশুর জ্বর (Fever in Children) অভিভাবকদের জন্য উদ্বেগের অন্যতম সাধারণ কারণ। তবে জ্বর নিজে কোনো রোগ নয়; এটি শরীরের একটি স্বাভাবিক প্রতিরক্ষামূলক প্রতিক্রিয়া, য..."

শিশুর জ্বর (Fever in Children) অভিভাবকদের জন্য উদ্বেগের অন্যতম সাধারণ কারণ। তবে জ্বর নিজে কোনো রোগ নয়; এটি শরীরের একটি স্বাভাবিক প্রতিরক্ষামূলক প্রতিক্রিয়া, যা ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা অন্যান্য সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শিশুদের জ্বর ভাইরাল সংক্রমণের কারণে হয় এবং কয়েক দিনের মধ্যে সেরে যায়। তবে কিছু ক্ষেত্রে এটি নিউমোনিয়া, মেনিনজাইটিস, ডেঙ্গু, মূত্রনালির সংক্রমণ (UTI) বা অন্যান্য গুরুতর রোগের লক্ষণ হতে পারে। তাই শিশুর বয়স, জ্বরের মাত্রা এবং অন্যান্য উপসর্গ বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।


শিশুর জ্বর কী?

শিশুর জ্বর (Fever in Children) হলো শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যাওয়া।

সাধারণভাবে—

  • মুখে (Oral): ৩৮°C (১০০.৪°F) বা তার বেশি

  • মলদ্বারে (Rectal): ৩৮°C (১০০.৪°F) বা তার বেশি

  • কানে (Tympanic): প্রায় ৩৮°C বা তার বেশি

  • বগলে (Axillary): ৩৭.৫°C বা তার বেশি হলে জ্বরের সন্দেহ করা যায় (মুখ বা মলদ্বারের তাপমাত্রা বেশি নির্ভুল)

জ্বরের মাত্রার চেয়ে শিশুর আচরণ, খাওয়া, শ্বাসপ্রশ্বাস এবং সার্বিক অবস্থা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।


সংক্ষেপে (Quick Facts)

বিষয়

তথ্য

চিকিৎসা নাম

Fever in Children

সাধারণ কারণ

ভাইরাল সংক্রমণ, ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ, ডেঙ্গু, ইনফ্লুয়েঞ্জা, UTI

জ্বর ধরা হয়

≥৩৮°C (মুখ বা মলদ্বার)

সাধারণ চিকিৎসা

পর্যাপ্ত তরল, বিশ্রাম, কারণভিত্তিক চিকিৎসা

কোন বিশেষজ্ঞ দেখাবেন

শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ (Pediatrician)

জরুরি পরিস্থিতি

৩ মাসের কম বয়সী শিশুর জ্বর, খিঁচুনি, শ্বাসকষ্ট, অচেতনতা

🚨 দ্রুত হাসপাতালে যান যদি—

  • শিশুর বয়স ৩ মাসের কম এবং তাপমাত্রা ৩৮°C বা তার বেশি হয়।

  • শ্বাসকষ্ট বা দ্রুত শ্বাস নেয়।

  • খিঁচুনি হয়।

  • বারবার বমি করে বা কিছুই খেতে পারে না।

  • অতিরিক্ত ঝিমিয়ে যায়, সাড়া কম দেয় বা অচেতন হয়ে পড়ে।

  • ডেঙ্গুর সতর্কতামূলক লক্ষণ বা রক্তপাত দেখা দেয়।


শিশুর জ্বর কি সবসময় গুরুতর রোগের লক্ষণ?

না।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শিশুদের জ্বর ভাইরাল সংক্রমণের কারণে হয় এবং ৩–৫ দিনের মধ্যে ভালো হয়ে যায়।

তবে নবজাতক ও ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে জ্বরকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত। জ্বর যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, বারবার ফিরে আসে অথবা গুরুতর উপসর্গ থাকে, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।


শিশুর জ্বরের লক্ষণ

জ্বরের সঙ্গে নিচের উপসর্গগুলো থাকতে পারে—

  • শরীর গরম লাগা

  • কাঁপুনি

  • খাওয়ার আগ্রহ কমে যাওয়া

  • অতিরিক্ত কান্না বা খিটখিটে ভাব

  • দুর্বলতা

  • ঘুম বেশি হওয়া

  • মাথাব্যথা (বড় শিশুদের ক্ষেত্রে)

  • শরীর ব্যথা

  • কাশি বা সর্দি

  • বমি বা ডায়রিয়া

  • পানিশূন্যতার লক্ষণ


শিশুর জ্বরের কারণ

১. ভাইরাল সংক্রমণ

সবচেয়ে সাধারণ কারণ।

যেমন—

  • সাধারণ সর্দি

  • ইনফ্লুয়েঞ্জা

  • কোভিড-১৯

  • ভাইরাল জ্বর


২. ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ

  • নিউমোনিয়া

  • কানের সংক্রমণ (Otitis Media)

  • টনসিলের সংক্রমণ

  • মূত্রনালির সংক্রমণ (UTI)


৩. ডেঙ্গু

ডেঙ্গুপ্রবণ এলাকায় বসবাস করলে বা মশার কামড়ের ইতিহাস থাকলে ডেঙ্গু বিবেচনা করা হয়।


৪. টিকা নেওয়ার পর

কিছু টিকা নেওয়ার পর ১–২ দিনের জন্য হালকা জ্বর হতে পারে, যা সাধারণত স্বাভাবিক।


৫. অন্যান্য কারণ

  • মেনিনজাইটিস

  • ম্যালেরিয়া (ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায়)

  • বিরল ক্ষেত্রে প্রদাহজনিত রোগ


ঝুঁকির কারণ

  • ৫ বছরের কম বয়স

  • ডে-কেয়ার বা স্কুলে যাওয়া

  • সংক্রমিত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা

  • টিকা অসম্পূর্ণ থাকা

  • দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা

  • অপুষ্টি


কীভাবে রোগ নির্ণয় করা হয়?

চিকিৎসক শিশুর ইতিহাস, শারীরিক পরীক্ষা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে কারণ নির্ণয় করেন।

রোগের ইতিহাস

  • কতদিন ধরে জ্বর

  • সর্বোচ্চ তাপমাত্রা

  • কাশি, সর্দি, বমি বা ডায়রিয়া আছে কি না

  • প্রস্রাবে সমস্যা

  • টিকা নেওয়ার ইতিহাস

  • সাম্প্রতিক ভ্রমণ

  • ডেঙ্গু আক্রান্ত এলাকায় অবস্থান


শারীরিক পরীক্ষা

  • তাপমাত্রা

  • ওজন

  • শ্বাসের হার

  • হৃদস্পন্দন

  • অক্সিজেন স্যাচুরেশন (প্রয়োজন হলে)

  • গলা, কান, ফুসফুস, ত্বক ও পেট পরীক্ষা


প্রয়োজনীয় পরীক্ষা

পরীক্ষা

কেন করা হয়

CBC

সংক্রমণের ধরন মূল্যায়ন

Dengue NS1/IgM

ডেঙ্গু সন্দেহ হলে

Urine R/E ও Culture

UTI শনাক্ত করতে

Blood Culture

গুরুতর ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ সন্দেহ হলে

Chest X-ray

নিউমোনিয়া সন্দেহ হলে

COVID-19 বা Influenza Test

প্রয়োজন অনুযায়ী

CRP বা Procalcitonin

কিছু ক্ষেত্রে ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণের সম্ভাবনা মূল্যায়নে

গুরুত্বপূর্ণ: সব শিশুর সব পরীক্ষা প্রয়োজন হয় না। চিকিৎসক উপসর্গ ও বয়স অনুযায়ী পরীক্ষা নির্ধারণ করেন।


শিশুর জ্বরের চিকিৎসা

চিকিৎসা সম্পূর্ণভাবে জ্বরের কারণ এবং শিশুর বয়সের ওপর নির্ভর করে।

ঘরোয়া পরিচর্যা

  • শিশুকে পর্যাপ্ত পানি, বুকের দুধ বা অন্যান্য তরল দিন।

  • হালকা পোশাক পরান।

  • বিশ্রাম নিতে দিন।

  • নিয়মিত তাপমাত্রা মাপুন।

  • শিশুকে জোর করে খাওয়ানোর চেষ্টা করবেন না; অল্প অল্প করে বারবার খেতে দিন।


ওষুধ

চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী দিতে পারেন—

  • প্যারাসিটামল (ওজন অনুযায়ী সঠিক মাত্রায়)

  • আইবুপ্রোফেন (শুধুমাত্র ৬ মাস বা তার বেশি বয়সী কিছু শিশুর ক্ষেত্রে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী)

  • কারণভিত্তিক অ্যান্টিবায়োটিক (যদি ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ নিশ্চিত বা অত্যন্ত সন্দেহজনক হয়)

গুরুত্বপূর্ণ: শিশুকে কখনোই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক দেবেন না। ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুদের ভাইরাল জ্বরের সময় অ্যাসপিরিন দেওয়া উচিত নয়, কারণ এতে বিরল কিন্তু গুরুতর Reye syndrome হওয়ার ঝুঁকি থাকে।


জ্বর হলে কী করবেন?

  • শিশুর শরীরের তাপমাত্রা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করুন।

  • পর্যাপ্ত তরল দিন।

  • শিশুর প্রস্রাবের পরিমাণ লক্ষ্য করুন।

  • চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী জ্বরের ওষুধ ব্যবহার করুন।

  • ডেঙ্গুর সন্দেহ থাকলে চিকিৎসকের নির্দেশনা ছাড়া আইবুপ্রোফেন বা অন্যান্য NSAID ব্যবহার করবেন না।


কখন জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন?

নিচের যেকোনো একটি লক্ষণ থাকলে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে যান—

  • ৩ মাসের কম বয়সী শিশুর জ্বর

  • খিঁচুনি

  • শ্বাসকষ্ট

  • অচেতনতা বা সাড়া কমে যাওয়া

  • ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া

  • ত্বকে বেগুনি বা লালচে দাগ যা চাপ দিলে মিলিয়ে যায় না

  • বারবার বমি

  • খাওয়া বা বুকের দুধ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া

  • প্রস্রাব খুব কম হওয়া

  • ডেঙ্গুর সতর্কতামূলক লক্ষণ


কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?

নিম্নোক্ত পরিস্থিতিতে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন—

  • জ্বর ৩ দিনের বেশি স্থায়ী হলে

  • জ্বর বারবার ফিরে এলে

  • শিশুর বয়স ৩–৬ মাস এবং তাপমাত্রা ৩৮.৫°C বা তার বেশি হলে

  • তীব্র কাশি, কানব্যথা বা প্রস্রাবে সমস্যা থাকলে

  • শিশু খুব দুর্বল বা অস্বাভাবিক আচরণ করলে

  • দীর্ঘমেয়াদি রোগ বা দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা থাকলে


সম্ভাব্য জটিলতা

চিকিৎসা না করলে বা গুরুতর সংক্রমণ হলে—

  • পানিশূন্যতা

  • নিউমোনিয়া

  • সেপসিস

  • জ্বরজনিত খিঁচুনি (Febrile Seizure)

  • মেনিনজাইটিস

  • ডেঙ্গুর জটিলতা


প্রতিরোধের উপায়

  • জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি অনুযায়ী সব টিকা সময়মতো দিন।

  • নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধোয়ান।

  • নিরাপদ খাবার ও বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিত করুন।

  • মশার কামড় থেকে শিশুকে সুরক্ষিত রাখুন।

  • অসুস্থ ব্যক্তির সংস্পর্শ এড়িয়ে চলুন।

  • শিশুকে পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার দিন।


প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

শিশুর জ্বর হলে কি সবসময় অ্যান্টিবায়োটিক লাগে?

না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভাইরাল সংক্রমণের কারণে জ্বর হয়, যেখানে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন হয় না।

শিশুর জ্বর হলে কি গোসল করানো যাবে?

হ্যাঁ। কুসুম গরম পানি দিয়ে গোসল করানো বা শরীর মুছে দেওয়া যেতে পারে। খুব ঠান্ডা পানি বা বরফ ব্যবহার করা উচিত নয়।

জ্বর হলে শিশুকে কী খাওয়াব?

বুকের দুধ, পানি, ওরস্যালাইন (প্রয়োজনে), স্যুপ এবং বয়স অনুযায়ী সহজপাচ্য পুষ্টিকর খাবার দিন।

জ্বরের সময় খিঁচুনি হলে কী করবেন?

শিশুকে কাত করে শুইয়ে দিন, মুখে কিছু দেবেন না এবং দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যান।

টিকা নেওয়ার পর জ্বর হলে কি উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত?

হালকা জ্বর অনেক টিকার পর স্বাভাবিক। তবে জ্বর বেশি হলে, দীর্ঘস্থায়ী হলে বা শিশুর অবস্থা খারাপ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

শিশুর জ্বর কতদিন থাকলে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে?

জ্বর ৩ দিনের বেশি থাকলে বা গুরুতর উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত শিশুরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।


মূল বিষয়গুলো (Key Takeaways)

  • শিশুর জ্বর সাধারণত ভাইরাল সংক্রমণের কারণে হয় এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নিজে থেকেই ভালো হয়ে যায়।

  • ৩ মাসের কম বয়সী শিশুর জ্বরকে সবসময় জরুরি হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

  • জ্বরের মাত্রার পাশাপাশি শিশুর আচরণ, শ্বাসপ্রশ্বাস, খাওয়া এবং পানিশূন্যতার লক্ষণ পর্যবেক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ।

  • চিকিৎসা কারণভিত্তিক; চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বা অন্য ওষুধ ব্যবহার করা উচিত নয়।

  • খিঁচুনি, শ্বাসকষ্ট, অচেতনতা, রক্তপাত বা ডেঙ্গুর সতর্কতামূলক লক্ষণ থাকলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে।


তথ্যসূত্র

  • World Health Organization (WHO)

  • American Academy of Pediatrics (AAP)

  • National Institute for Health and Care Excellence (NICE)

  • Centers for Disease Control and Prevention (CDC)


Medical Review

গুরুত্বপূর্ণ: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র স্বাস্থ্যশিক্ষার উদ্দেশ্যে প্রস্তুত করা হয়েছে। এটি চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। ৩ মাসের কম বয়সী শিশুর জ্বর, শ্বাসকষ্ট, খিঁচুনি, অচেতনতা, বারবার বমি, ডেঙ্গুর সতর্কতামূলক লক্ষণ বা শিশুর অবস্থা দ্রুত খারাপ হলে অবিলম্বে নিকটস্থ হাসপাতালে যান অথবা একজন শিশুরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

এই নিবন্ধটি আন্তর্জাতিক চিকিৎসা নির্দেশিকা এবং নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়মিত হালনাগাদ করা হয় যাতে পাঠক সর্বশেষ ও নির্ভরযোগ্য স্বাস্থ্যতথ্য পান।

Content prepared by: Doctors24 Editorial Team

Medical information is verified using registered doctor data and trusted healthcare sources

Information sources: Public records, hospital data, and provided credentials

Published At: July 28, 2026

Last updated: July 28, 2026 Read Editorial Policy →

Related Child Specialist Articles

View all →