কিডনিতে পাথর (Kidney Stones): কারণ, লক্ষণ, পরীক্ষা, চিকিৎসা ও প্রতিরোধ

"কিডনিতে পাথর (Kidney Stones) বা রেনাল স্টোন (Renal Calculi) হলো কিডনির ভেতরে খনিজ ও লবণের স্ফটিক জমে শক্ত পাথর তৈরি হওয়া। পাথরের আকার বালুকণার মতো ছোট থেকে কয়..."
কিডনিতে পাথর (Kidney Stones) বা রেনাল স্টোন (Renal Calculi) হলো কিডনির ভেতরে খনিজ ও লবণের স্ফটিক জমে শক্ত পাথর তৈরি হওয়া। পাথরের আকার বালুকণার মতো ছোট থেকে কয়েক সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে। ছোট পাথর অনেক সময় প্রস্রাবের সঙ্গে বের হয়ে যায়, তবে বড় পাথর তীব্র ব্যথা, প্রস্রাবে রক্ত, সংক্রমণ বা কিডনির ক্ষতির কারণ হতে পারে।
সময়মতো রোগ নির্ণয় ও সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে অধিকাংশ কিডনির পাথর সফলভাবে নিয়ন্ত্রণ বা অপসারণ করা যায়।
কিডনিতে পাথর (Kidney Stones) কী?
প্রস্রাবে থাকা ক্যালসিয়াম, অক্সালেট, ইউরিক অ্যাসিড বা অন্যান্য খনিজের মাত্রা বেশি হলে সেগুলো স্ফটিক তৈরি করে। সময়ের সঙ্গে এই স্ফটিকগুলো একত্রিত হয়ে পাথরে পরিণত হয়।
পাথর কিডনিতে থাকতে পারে অথবা ইউরেটার (Ureter) দিয়ে মূত্রথলির দিকে নামতে পারে। ইউরেটারে আটকে গেলে তীব্র ব্যথা (Renal Colic) হয়।
সংক্ষেপে (Quick Facts)
বিষয় | তথ্য |
|---|---|
চিকিৎসা নাম | Nephrolithiasis / Urolithiasis |
সাধারণ নাম | Kidney Stones |
প্রধান কারণ | ক্যালসিয়াম, ইউরিক অ্যাসিড বা অন্যান্য খনিজের স্ফটিক জমা |
সাধারণ উপসর্গ | তীব্র কোমর ব্যথা, প্রস্রাবে রক্ত, বমি, প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া |
গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা | Non-Contrast CT KUB, Ultrasound, Urine Test |
কোন বিশেষজ্ঞ দেখাবেন | ইউরোলজিস্ট বা নেফ্রোলজিস্ট |
🚨 কখন জরুরি চিকিৎসা নেবেন?
নিচের যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যান—
অসহ্য কোমর বা পাশের ব্যথা
জ্বর ও কাঁপুনির সঙ্গে পাথরের উপসর্গ
প্রস্রাব একেবারে বন্ধ হয়ে যাওয়া
বারবার বমি হওয়া
প্রচুর রক্তমিশ্রিত প্রস্রাব
একমাত্র কার্যকর কিডনিতে পাথরের সন্দেহ
এগুলো কিডনির গুরুতর জটিলতার লক্ষণ হতে পারে।
কিডনির পাথরের ধরন
১. Calcium Stones
সবচেয়ে সাধারণ (প্রায় ৭০–৮০%)। সাধারণত ক্যালসিয়াম অক্সালেট বা ক্যালসিয়াম ফসফেট দিয়ে তৈরি।
২. Uric Acid Stones
প্রস্রাব বেশি অম্লীয় (Acidic) হলে এবং গাউট বা উচ্চ ইউরিক অ্যাসিড থাকলে বেশি হয়।
৩. Struvite Stones
সাধারণত বারবার মূত্রনালির সংক্রমণের (UTI) কারণে হয়।
৪. Cystine Stones
বিরল। বংশগত রোগ Cystinuria-এর কারণে হয়।
কিডনিতে পাথর হওয়ার কারণ
পর্যাপ্ত পানি না পান করা
প্রস্রাব ঘন হয়ে যাওয়া
অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ
অতিরিক্ত প্রাণিজ প্রোটিন
বেশি অক্সালেটযুক্ত খাবার (যেমন পালং শাক, বিট, বাদাম)
স্থূলতা
গাউট
Hyperparathyroidism
কিছু ওষুধ
পারিবারিক ইতিহাস
ঝুঁকির কারণ
পূর্বে কিডনিতে পাথর হওয়া
পরিবারে পাথরের ইতিহাস
গরম আবহাওয়ায় বসবাস
পর্যাপ্ত পানি না পান করা
স্থূলতা
ডায়াবেটিস
গাউট
দীর্ঘদিন বিছানায় থাকা
কিডনিতে পাথরের লক্ষণ
ছোট পাথরে কোনো উপসর্গ নাও থাকতে পারে।
পাথর ইউরেটারে নামলে দেখা দিতে পারে—
কোমরের এক পাশে তীব্র ব্যথা (Renal Colic)
ব্যথা কুঁচকি পর্যন্ত ছড়িয়ে যাওয়া
প্রস্রাবে রক্ত
প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া
ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ
বমি বমি ভাব বা বমি
অস্থিরতা
জ্বর (সংক্রমণ থাকলে)
কীভাবে রোগ নির্ণয় করা হয়?
চিকিৎসকের মূল্যায়ন
রোগের ইতিহাস
ব্যথার ধরন
শারীরিক পরীক্ষা
প্রস্রাব পরীক্ষা
Urinalysis
Urine Culture (সংক্রমণের সন্দেহে)
রক্ত পরীক্ষা
Kidney Function Test
Serum Creatinine
Calcium
Uric Acid
Electrolytes
ইমেজিং
Non-Contrast CT KUB – সবচেয়ে নির্ভুল পরীক্ষা।
অন্যান্য পরীক্ষা—
Ultrasound KUB
X-ray KUB (নির্বাচিত ক্ষেত্রে)
পুনঃপাথর হওয়ার ক্ষেত্রে
২৪ ঘণ্টার প্রস্রাব পরীক্ষা (24-Hour Urine Collection)
বের হওয়া পাথরের রাসায়নিক বিশ্লেষণ (Stone Analysis)
কিডনিতে পাথরের চিকিৎসা
চিকিৎসা নির্ভর করে—
পাথরের আকার
অবস্থান
উপসর্গ
জটিলতা
১. ছোট পাথর (≤৫ মিমি)
অনেক ক্ষেত্রেই নিজে থেকেই বের হয়ে যায়।
চিকিৎসা—
প্রচুর পানি পান
ব্যথানাশক
প্রয়োজনে Medical Expulsive Therapy (যেমন নির্বাচিত রোগীর ক্ষেত্রে Alpha-blocker)
২. বড় পাথর
নিজে থেকে বের হওয়ার সম্ভাবনা কম।
চিকিৎসা হতে পারে—
Extracorporeal Shock Wave Lithotripsy (ESWL)
Ureteroscopy (URS)
Percutaneous Nephrolithotomy (PCNL)
বিরল ক্ষেত্রে ওপেন বা ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারি
৩. সংক্রমণ থাকলে
জরুরি ভিত্তিতে—
অ্যান্টিবায়োটিক
প্রস্রাবের বাধা দূর করার ব্যবস্থা (Stent বা Nephrostomy)
প্রয়োজন হতে পারে।
বাসায় কী করবেন?
প্রতিদিন পর্যাপ্ত পানি পান করুন (সাধারণত এমন পরিমাণ যাতে দিনে ২–২.৫ লিটার প্রস্রাব হয়; চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী)।
ব্যথার সময় চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ নিন।
পাথর বের হলে সংরক্ষণ করে চিকিৎসককে দেখান।
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া হারবাল বা ভেষজ ওষুধ ব্যবহার করবেন না।
খাদ্যাভ্যাস ও প্রতিরোধ
যা করবেন
পর্যাপ্ত পানি পান করুন।
লবণ কম খান।
ফল ও শাকসবজি বেশি খান।
স্বাভাবিক পরিমাণ ক্যালসিয়ামযুক্ত খাবার গ্রহণ করুন।
যা সীমিত করবেন
অতিরিক্ত লবণ
অতিরিক্ত লাল মাংস
অতিরিক্ত চিনি
বেশি অক্সালেটযুক্ত খাবার (ঝুঁকিপূর্ণ রোগীর ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী)
সম্ভাব্য জটিলতা
চিকিৎসা না করলে হতে পারে—
মূত্রনালির বাধা
Hydronephrosis
বারবার UTI
Sepsis
কিডনির স্থায়ী ক্ষতি
Chronic Kidney Disease (বিরল ক্ষেত্রে)
পুনরায় পাথর হওয়া কীভাবে প্রতিরোধ করবেন?
প্রতিদিন পর্যাপ্ত পানি পান করুন।
লবণ কমান।
ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
ডায়াবেটিস ও গাউট নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রতিরোধমূলক ওষুধ গ্রহণ করুন।
পূর্বে পাথর হলে নিয়মিত ফলো-আপ করুন।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
অবশ্যই ইউরোলজিস্টের পরামর্শ নিন যদি—
তীব্র কোমর ব্যথা হয়
প্রস্রাবে রক্ত আসে
জ্বরের সঙ্গে ব্যথা থাকে
প্রস্রাব বন্ধ হয়ে যায়
বারবার পাথর হয়
একটি কিডনি থাকলে বা কিডনির কার্যক্ষমতা কম থাকলে
প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
কিডনির ছোট পাথর কি নিজে থেকেই বের হয়ে যায়?
হ্যাঁ। সাধারণত ৫ মিমি বা তার কম আকারের অনেক পাথর পর্যাপ্ত পানি পান ও উপযুক্ত চিকিৎসায় নিজে থেকেই বের হয়ে যেতে পারে।
কিডনিতে পাথর হলে কি সবসময় অপারেশন লাগে?
না। পাথরের আকার, অবস্থান ও উপসর্গের ওপর নির্ভর করে অনেক ক্ষেত্রে অপারেশন ছাড়াই চিকিৎসা সম্ভব।
কিডনিতে পাথর কি আবার হতে পারে?
হ্যাঁ। একবার পাথর হলে ভবিষ্যতে আবার হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ।
বেশি পানি পান করলে কি পাথর প্রতিরোধ করা যায়?
হ্যাঁ। পর্যাপ্ত পানি পান কিডনির পাথর প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলোর একটি।
কিডনিতে পাথর কি কিডনি নষ্ট করতে পারে?
চিকিৎসা না করলে বড় পাথর বা দীর্ঘদিনের বাধা কিডনির স্থায়ী ক্ষতির কারণ হতে পারে।
মূল বিষয়গুলো (Key Takeaways)
কিডনিতে পাথর হলো খনিজ ও লবণের স্ফটিক জমে তৈরি হওয়া কঠিন পদার্থ।
তীব্র কোমর ব্যথা, প্রস্রাবে রক্ত এবং বমি সাধারণ লক্ষণ।
Non-Contrast CT KUB রোগ নির্ণয়ের সবচেয়ে নির্ভুল পরীক্ষা।
ছোট পাথর নিজে থেকেই বের হতে পারে, তবে বড় পাথরে ESWL, URS বা PCNL প্রয়োজন হতে পারে।
পর্যাপ্ত পানি পান এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস পুনরায় পাথর হওয়ার ঝুঁকি কমায়।
তথ্যসূত্র
European Association of Urology (EAU) Guidelines on Urolithiasis
American Urological Association (AUA)
National Institute for Health and Care Excellence (NICE)
Kidney Disease: Improving Global Outcomes (KDIGO)
National Kidney Foundation (NKF)
World Health Organization (WHO)
Medical Review
গুরুত্বপূর্ণ: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র স্বাস্থ্যশিক্ষার উদ্দেশ্যে প্রস্তুত করা হয়েছে। এটি ব্যক্তিগত চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়। আপনার যদি তীব্র কোমর ব্যথা, প্রস্রাবে রক্ত, জ্বর, প্রস্রাবে বাধা বা বারবার কিডনিতে পাথর হওয়ার ইতিহাস থাকে, তাহলে দ্রুত একজন ইউরোলজিস্ট বা নেফ্রোলজিস্ট-এর পরামর্শ নিন। জ্বরের সঙ্গে পাথরের উপসর্গ, প্রস্রাব বন্ধ হয়ে যাওয়া বা অসহ্য ব্যথা হলে অবিলম্বে জরুরি চিকিৎসা গ্রহণ করুন।
এই নিবন্ধটি EAU, AUA, KDIGO, NICE, NKF এবং WHO-এর সর্বশেষ আন্তর্জাতিক ক্লিনিক্যাল নির্দেশিকার ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে এবং নির্ভুল, প্রমাণভিত্তিক ও হালনাগাদ চিকিৎসা তথ্য নিশ্চিত করতে নিয়মিত পর্যালোচনা করা হয়।
Content prepared by: Doctors24 Editorial Team
Medical information is verified using registered doctor data and trusted healthcare sources
Information sources: Public records, hospital data, and provided credentials
Published At: July 31, 2026
Last updated: July 31, 2026 • Read Editorial Policy →
Find Nephrologist in Your Area
Connect with experienced nephrologist near you for consultation and treatment.





