কিডনিতে পাথর: কারণ, লক্ষণ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধ

Doctors24 Editorial TeamJuly 28, 2026
কিডনিতে পাথর: কারণ, লক্ষণ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধ
Key Overview

"কিডনিতে পাথর (Kidney Stone) বা রেনাল স্টোন (Renal Stone) হলো কিডনির ভেতরে খনিজ লবণ ও অন্যান্য পদার্থ জমে শক্ত স্ফটিক (Crystal) তৈরি হওয়া। ছোট পাথর অনেক সময় কো..."

কিডনিতে পাথর (Kidney Stone) বা রেনাল স্টোন (Renal Stone) হলো কিডনির ভেতরে খনিজ লবণ ও অন্যান্য পদার্থ জমে শক্ত স্ফটিক (Crystal) তৈরি হওয়া। ছোট পাথর অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই প্রস্রাবের সঙ্গে বেরিয়ে যেতে পারে। তবে বড় পাথর মূত্রনালীতে আটকে গেলে তীব্র ব্যথা, প্রস্রাবে রক্ত এবং সংক্রমণের মতো গুরুতর সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।

বিশ্বব্যাপী কিডনিতে পাথর একটি সাধারণ রোগ এবং এর পুনরাবৃত্তির ঝুঁকিও তুলনামূলক বেশি। পর্যাপ্ত পানি পান, খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন এবং প্রয়োজনে ওষুধের মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রেই এটি প্রতিরোধ করা সম্ভব।


কিডনিতে পাথর কী?

কিডনিতে পাথর (Kidney Stone) হলো কিডনির ভেতরে প্রস্রাবের বিভিন্ন খনিজ পদার্থ, যেমন ক্যালসিয়াম, অক্সালেট বা ইউরিক অ্যাসিড জমে শক্ত স্ফটিক তৈরি হওয়া।

পাথর কিডনিতে থাকতে পারে বা কিডনি থেকে মূত্রনালী (Ureter)-তে নেমে এসে প্রস্রাবের প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। তখন সাধারণত তীব্র ব্যথা শুরু হয়, যাকে রেনাল কোলিক (Renal Colic) বলা হয়।


সংক্ষেপে (Quick Facts)

বিষয়

তথ্য

চিকিৎসা নাম

Nephrolithiasis / Urolithiasis

প্রধান লক্ষণ

কোমর বা পাশের তীব্র ব্যথা, প্রস্রাবে রক্ত

সবচেয়ে সাধারণ পাথর

Calcium Oxalate Stone

ঝুঁকি বেশি

কম পানি পান, স্থূলতা, পারিবারিক ইতিহাস

কোন বিশেষজ্ঞ দেখাবেন

ইউরোলজিস্ট

চিকিৎসা

পানি, ওষুধ, ESWL, URS, PCNL বা অস্ত্রোপচার

🚨 জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে যান যদি—

  • তীব্র ব্যথার সঙ্গে জ্বর বা কাঁপুনি থাকে।

  • প্রস্রাব একেবারে বন্ধ হয়ে যায়।

  • একমাত্র কার্যকর কিডনিতে পাথর থাকে এবং ব্যথা শুরু হয়।

  • বারবার বমির কারণে পানি পান করা সম্ভব না হয়।

  • গর্ভাবস্থায় তীব্র কোমর ব্যথা ও প্রস্রাবের সমস্যা দেখা দেয়।


কিডনিতে পাথর কি সবসময় অপারেশন লাগে?

না।

অনেক ছোট পাথর (বিশেষ করে ৫ মিলিমিটারের কম) পর্যাপ্ত পানি পান, ব্যথানাশক ও প্রয়োজনে ওষুধের সাহায্যে স্বাভাবিকভাবেই প্রস্রাবের সঙ্গে বেরিয়ে যেতে পারে।

তবে বড় পাথর, সংক্রমণ, কিডনির কার্যকারিতা কমে যাওয়া বা দীর্ঘদিন বাধা থাকলে বিশেষ চিকিৎসা বা অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হতে পারে।


কিডনিতে পাথরের লক্ষণ

তীব্র কোমর বা পাশের ব্যথা

সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ হলো—

  • কোমরের একপাশে হঠাৎ তীব্র ব্যথা

  • ব্যথা তলপেট বা কুঁচকিতে ছড়িয়ে পড়া

  • ঢেউয়ের মতো ওঠানামা করা ব্যথা

প্রস্রাবের সমস্যা

  • প্রস্রাবে রক্ত (Hematuria)

  • প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া

  • ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ

  • প্রস্রাব কম হওয়া

অন্যান্য লক্ষণ

  • বমি বমি ভাব বা বমি

  • অস্থিরতা

  • জ্বর ও কাঁপুনি (সংক্রমণ হলে)

  • দুর্গন্ধযুক্ত বা ঘোলা প্রস্রাব


কিডনিতে পাথর কেন হয়?

১. কম পানি পান

পর্যাপ্ত পানি না পান করলে প্রস্রাব ঘন হয়ে যায় এবং খনিজ পদার্থ জমে পাথর তৈরি হতে পারে।

২. খাদ্যাভ্যাস

  • অতিরিক্ত লবণ

  • অতিরিক্ত প্রাণিজ প্রোটিন

  • অতিরিক্ত অক্সালেটসমৃদ্ধ খাবার (যেমন পালং শাক, বিট, বাদাম)

৩. কিছু রোগ

  • গাউট

  • Hyperparathyroidism

  • Crohn's disease

  • স্থূলতা

  • টাইপ ২ ডায়াবেটিস

৪. পারিবারিক ইতিহাস

পরিবারে কিডনিতে পাথরের ইতিহাস থাকলে ঝুঁকি বেড়ে যায়।

৫. কিছু ওষুধ

কিছু ওষুধ দীর্ঘদিন সেবনে পাথর হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।


কিডনিতে পাথরের ধরন

  • Calcium Oxalate Stone (সবচেয়ে সাধারণ)

  • Calcium Phosphate Stone

  • Uric Acid Stone

  • Struvite Stone

  • Cystine Stone (বিরল)


ঝুঁকির কারণ

  • পর্যাপ্ত পানি না পান করা

  • গরম আবহাওয়ায় কাজ করা

  • স্থূলতা

  • অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ

  • অতিরিক্ত প্রাণিজ প্রোটিন

  • পরিবারে পাথরের ইতিহাস

  • পূর্বে কিডনিতে পাথর হওয়া

  • কিছু বিপাকীয় (Metabolic) রোগ


কীভাবে রোগ নির্ণয় করা হয়?

চিকিৎসক রোগীর উপসর্গ, শারীরিক পরীক্ষা এবং বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে রোগ নির্ণয় করেন।

শারীরিক পরীক্ষা

  • কোমরের পাশে (Flank) চাপ দিলে ব্যথা

  • জ্বর আছে কি না

  • পানিশূন্যতার লক্ষণ


প্রয়োজনীয় পরীক্ষা

পরীক্ষা

কেন করা হয়

Urine Routine & Microscopy

রক্ত, সংক্রমণ ও স্ফটিক শনাক্ত করতে

Urine Culture

সংক্রমণ নিশ্চিত করতে

CBC

সংক্রমণ মূল্যায়ন

Kidney Function Test (Creatinine)

কিডনির কার্যকারিতা জানতে

Serum Calcium ও Uric Acid

বিপাকীয় কারণ মূল্যায়নে

Ultrasound KUB

কিডনি ও মূত্রনালীর পাথর শনাক্ত করতে

Non-Contrast CT KUB

কিডনিতে পাথর নির্ণয়ের সবচেয়ে সংবেদনশীল পরীক্ষা

Stone Analysis

বের হওয়া পাথরের ধরন নির্ধারণে


কিডনিতে পাথরের চিকিৎসা

চিকিৎসা নির্ভর করে—

  • পাথরের আকার

  • অবস্থান

  • উপসর্গ

  • সংক্রমণ আছে কি না

  • কিডনির কার্যকারিতা

১. ওষুধ ও পর্যবেক্ষণ

ছোট পাথরের ক্ষেত্রে—

  • পর্যাপ্ত পানি পান

  • ব্যথানাশক

  • প্রয়োজনে Alpha-blocker (যেমন Tamsulosin) দিয়ে পাথর বের হতে সাহায্য করা হতে পারে (নির্বাচিত রোগীর ক্ষেত্রে)

২. ESWL (Extracorporeal Shock Wave Lithotripsy)

শক ওয়েভের সাহায্যে পাথর ভেঙে ছোট করা হয় যাতে তা প্রস্রাবের সঙ্গে বেরিয়ে যেতে পারে।

৩. URS (Ureteroscopy)

ক্যামেরাযুক্ত সরু যন্ত্র দিয়ে মূত্রনালী দিয়ে প্রবেশ করে পাথর অপসারণ বা লেজারের সাহায্যে ভেঙে ফেলা হয়।

৪. PCNL (Percutaneous Nephrolithotomy)

বড় (সাধারণত ২ সেন্টিমিটারের বেশি) বা জটিল কিডনির পাথরের জন্য পিঠে ছোট ছিদ্র করে অস্ত্রোপচার করা হয়।

৫. ওপেন বা ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারি

বর্তমানে খুব কম ক্ষেত্রেই প্রয়োজন হয়।


ঘরোয়া করণীয়

  • প্রতিদিন পর্যাপ্ত পানি পান করুন (চিকিৎসকের ভিন্ন নির্দেশ না থাকলে এমন পরিমাণে যাতে দিনে অন্তত ২–২.৫ লিটার প্রস্রাব হয়)।

  • চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ করুন।

  • পাথর বের হলে পরিষ্কার পাত্রে সংরক্ষণ করে পরীক্ষার জন্য নিয়ে যান।

  • অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ কমান।


কখন দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাবেন?

নিচের যেকোনো লক্ষণ থাকলে দ্রুত ইউরোলজিস্ট বা নিকটস্থ হাসপাতালে যান—

  • অসহনীয় কোমর ব্যথা

  • জ্বর ও কাঁপুনি

  • প্রস্রাব বন্ধ হয়ে যাওয়া

  • প্রস্রাবে অতিরিক্ত রক্ত

  • একমাত্র কার্যকর কিডনিতে ব্যথা

  • গর্ভাবস্থায় তীব্র ব্যথা


সম্ভাব্য জটিলতা

চিকিৎসা না করলে হতে পারে—

  • মূত্রনালীতে বাধা

  • কিডনির সংক্রমণ

  • কিডনিতে পুঁজ (Pyonephrosis)

  • কিডনির কার্যকারিতা কমে যাওয়া

  • Sepsis (গুরুতর সংক্রমণ)

  • পুনরায় পাথর হওয়া


কিডনিতে পাথর প্রতিরোধের উপায়

পর্যাপ্ত পানি পান করুন

এটি সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা।

লবণ কম খান

অতিরিক্ত সোডিয়াম প্রস্রাবে ক্যালসিয়াম বাড়ায় এবং পাথরের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে।

পর্যাপ্ত খাদ্য ক্যালসিয়াম গ্রহণ করুন

চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ক্যালসিয়াম সম্পূর্ণ বন্ধ করবেন না। স্বাভাবিক খাদ্য থেকে ক্যালসিয়াম গ্রহণ বরং অনেক ক্ষেত্রে উপকারী।

অক্সালেটসমৃদ্ধ খাবার পরিমিত খান

যদি Calcium Oxalate Stone হওয়ার প্রবণতা থাকে, তাহলে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী খাদ্য নির্বাচন করুন।

প্রাণিজ প্রোটিন সীমিত করুন

অতিরিক্ত লাল মাংস ও প্রাণিজ প্রোটিন ইউরিক অ্যাসিড পাথরের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখুন

নিয়মিত ব্যায়াম ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখুন।


প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

কিডনিতে পাথর কি নিজে থেকেই বের হয়ে যেতে পারে?

হ্যাঁ। অনেক ছোট পাথর কোনো অস্ত্রোপচার ছাড়াই প্রস্রাবের সঙ্গে বের হয়ে যায়।

কিডনিতে পাথর হলে কি সবসময় অপারেশন লাগে?

না। পাথরের আকার, অবস্থান ও উপসর্গের ওপর চিকিৎসা নির্ভর করে।

কিডনিতে পাথর কি আবার হতে পারে?

হ্যাঁ। একবার পাথর হলে ভবিষ্যতে আবার হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ।

ক্যালসিয়ামযুক্ত খাবার কি পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে?

না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্বাভাবিক খাদ্য থেকে ক্যালসিয়াম গ্রহণ চালিয়ে যাওয়া উচিত। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করা প্রয়োজন হতে পারে।

লেবুর পানি কি উপকারী?

কিছু ক্ষেত্রে লেবুর সাইট্রেট (Citrate) ক্যালসিয়াম পাথর হওয়ার ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে। তবে এটি চিকিৎসার বিকল্প নয় এবং সবার জন্য একইভাবে প্রযোজ্য নয়।


মূল বিষয়গুলো (Key Takeaways)

  • কিডনিতে পাথর একটি সাধারণ কিন্তু চিকিৎসাযোগ্য রোগ।

  • তীব্র কোমর ব্যথা, প্রস্রাবে রক্ত ও বমি এর প্রধান লক্ষণ।

  • ছোট পাথর অনেক সময় নিজে থেকেই বের হয়ে যায়।

  • বড় বা জটিল পাথরের ক্ষেত্রে ESWL, URS বা PCNL-এর মতো আধুনিক চিকিৎসা কার্যকর।

  • পর্যাপ্ত পানি পান, লবণ কম খাওয়া এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন কিডনিতে পাথর প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ।


তথ্যসূত্র

  • European Association of Urology (EAU) Guidelines on Urolithiasis

  • American Urological Association (AUA) Guideline: Surgical Management of Stones

  • National Institute for Health and Care Excellence (NICE)

  • National Kidney Foundation (NKF)

  • European Society of Urogenital Radiology (ESUR)


Medical Review

গুরুত্বপূর্ণ: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র স্বাস্থ্যশিক্ষার উদ্দেশ্যে প্রস্তুত করা হয়েছে। এটি চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। যদি তীব্র কোমর ব্যথা, জ্বর, প্রস্রাব বন্ধ হয়ে যাওয়া বা প্রস্রাবে রক্ত দেখা দেয়, তাহলে দ্রুত একজন ইউরোলজিস্ট বা নিকটস্থ হাসপাতালে যোগাযোগ করুন।

Content prepared by: Doctors24 Editorial Team

Medical information is verified using registered doctor data and trusted healthcare sources

Information sources: Public records, hospital data, and provided credentials

Published At: July 28, 2026

Last updated: July 28, 2026 Read Editorial Policy →

Related Urologist Articles

View all →