একজিমা (Eczema): কারণ, লক্ষণ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধ

Doctors24 Editorial TeamAugust 7, 2026
একজিমা (Eczema): কারণ, লক্ষণ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধ
Key Overview

"একজিমা (Eczema) বা অ্যাটোপিক ডার্মাটাইটিস (Atopic Dermatitis) একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহজনিত ত্বকের রোগ, যেখানে ত্বক শুষ্ক, চুলকানিযুক্ত, লাল এবং সংবেদনশীল হয়ে প..."

একজিমা (Eczema) বা অ্যাটোপিক ডার্মাটাইটিস (Atopic Dermatitis) একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহজনিত ত্বকের রোগ, যেখানে ত্বক শুষ্ক, চুলকানিযুক্ত, লাল এবং সংবেদনশীল হয়ে পড়ে। এটি শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা গেলেও যেকোনো বয়সে হতে পারে।

একজিমা সংক্রামক নয় এবং একজনের থেকে আরেকজনের মধ্যে ছড়ায় না। সঠিক ত্বকের যত্ন, ট্রিগার এড়িয়ে চলা এবং প্রয়োজনে ওষুধ ব্যবহারের মাধ্যমে অধিকাংশ রোগীর উপসর্গ ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।


একজিমা কী?

একজিমা (Eczema) হলো ত্বকের সুরক্ষাব্যবস্থার (Skin Barrier) দুর্বলতা এবং রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ার কারণে হওয়া একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহজনিত রোগ।

এর ফলে ত্বক—

  • শুষ্ক হয়ে যায়

  • তীব্র চুলকায়

  • লাল বা কালচে হয়ে যায়

  • ফেটে যেতে পারে

  • বারবার সংক্রমিত হতে পারে

সবচেয়ে সাধারণ ধরনের একজিমা হলো Atopic Dermatitis


সংক্ষেপে (Quick Facts)

বিষয়

তথ্য

চিকিৎসা নাম

Atopic Dermatitis (Eczema)

এটি কি সংক্রামক?

না

প্রধান লক্ষণ

চুলকানি, শুষ্ক ত্বক, লাল ফুসকুড়ি

বেশি দেখা যায়

শিশুদের মধ্যে, তবে সব বয়সেই হতে পারে

কোন বিশেষজ্ঞ দেখাবেন

চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ (Dermatologist)

চিকিৎসা

ময়েশ্চারাইজার, স্টেরয়েড ক্রিম, অন্যান্য প্রদাহনাশক ওষুধ

🚨 দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন যদি—

  • একজিমার সঙ্গে পুঁজ, তীব্র ব্যথা বা জ্বর হয়।

  • ত্বক থেকে হলুদ রস বের হয়।

  • শরীরের বড় অংশ আক্রান্ত হয়।

  • ঘরোয়া পরিচর্যা বা সাধারণ চিকিৎসায় উন্নতি না হয়।

  • চোখের চারপাশে একজিমা হয় বা দৃষ্টিতে সমস্যা দেখা দেয়।


একজিমার লক্ষণ

বয়স ও রোগের তীব্রতা অনুযায়ী লক্ষণ ভিন্ন হতে পারে।

সাধারণ লক্ষণ

  • তীব্র চুলকানি

  • শুষ্ক ও খসখসে ত্বক

  • লাল বা গাঢ় রঙের ফুসকুড়ি

  • ত্বক মোটা হয়ে যাওয়া (Lichenification)

  • ত্বক ফেটে যাওয়া

  • চুলকানোর কারণে ক্ষত হওয়া

শিশুদের ক্ষেত্রে

সাধারণত দেখা যায়—

  • গাল

  • মাথার ত্বক

  • হাত ও পা

বড় শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে

বেশি আক্রান্ত হয়—

  • কনুইয়ের ভাঁজ

  • হাঁটুর পেছন

  • ঘাড়

  • কবজি

  • হাত

  • চোখের চারপাশ


একজিমার কারণ

একজিমার একক কোনো কারণ নেই। এটি জিনগত, পরিবেশগত এবং রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার সম্মিলিত প্রভাবে হয়।

১. বংশগত কারণ

পরিবারে একজিমা, হাঁপানি বা অ্যালার্জির ইতিহাস থাকলে ঝুঁকি বেশি।

২. ত্বকের সুরক্ষাব্যবস্থা দুর্বল হওয়া

ত্বক সহজে আর্দ্রতা হারায় এবং বাইরের জীবাণু বা অ্যালার্জেন সহজে প্রবেশ করতে পারে।

৩. রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার পরিবর্তন

ত্বকে অতিরিক্ত প্রদাহ সৃষ্টি হয়।


একজিমা বাড়িয়ে দিতে পারে যেসব বিষয়

  • শুষ্ক আবহাওয়া

  • অতিরিক্ত গরম বা ঘাম

  • ধুলাবালি

  • সাবান বা ডিটারজেন্ট

  • সুগন্ধিযুক্ত প্রসাধনী

  • উলের পোশাক

  • মানসিক চাপ

  • কিছু সংক্রমণ


ঝুঁকির কারণ

  • পরিবারে একজিমা

  • হাঁপানি

  • অ্যালার্জিক রাইনাইটিস

  • শিশু বয়স

  • শুষ্ক আবহাওয়ায় বসবাস

  • ত্বকের অতিরিক্ত শুষ্কতা


কীভাবে রোগ নির্ণয় করা হয়?

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ত্বক পরীক্ষা এবং রোগের ইতিহাস শুনেই রোগ নির্ণয় করতে পারেন।

অতিরিক্ত পরীক্ষা (প্রয়োজন হলে)

পরীক্ষা

কেন করা হয়

Patch Test

Contact Allergy সন্দেহ হলে

Skin Swab

সংক্রমণ সন্দেহ হলে

IgE Test

নির্বাচিত ক্ষেত্রে অ্যালার্জি মূল্যায়নে

Skin Biopsy

বিরল ক্ষেত্রে অন্য রোগ থেকে পার্থক্য করতে

গুরুত্বপূর্ণ: একজিমা নির্ণয়ের জন্য সাধারণত রক্ত পরীক্ষা প্রয়োজন হয় না।


একজিমার চিকিৎসা

চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হলো—

  • চুলকানি কমানো

  • প্রদাহ নিয়ন্ত্রণ করা

  • ত্বকের সুরক্ষা বজায় রাখা

  • সংক্রমণ প্রতিরোধ করা

১. ময়েশ্চারাইজার (সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ)

  • দিনে অন্তত ২–৩ বার ব্যবহার করুন।

  • গোসলের পরপরই লাগানো সবচেয়ে উপকারী।

২. স্টেরয়েড ক্রিম

প্রদাহ কমাতে চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দিষ্ট শক্তির Topical Corticosteroid প্রেসক্রাইব করতে পারেন।

চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘদিন স্টেরয়েড ক্রিম ব্যবহার করবেন না।

৩. Calcineurin Inhibitor

Tacrolimus বা Pimecrolimus-এর মতো ওষুধ মুখ, চোখের চারপাশ বা দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারের প্রয়োজন হলে নির্বাচিত রোগীর ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হতে পারে।

৪. অ্যান্টিহিস্টামিন

কিছু রোগীর ক্ষেত্রে চুলকানি কমাতে ব্যবহার করা হতে পারে।

৫. সংক্রমণের চিকিৎসা

ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ হলে উপযুক্ত অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন হতে পারে।

৬. উন্নত চিকিৎসা

মাঝারি থেকে গুরুতর একজিমার ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী—

  • Phototherapy

  • Biologic Therapy (যেমন Dupilumab)

  • JAK Inhibitor

  • অন্যান্য Immunosuppressive ওষুধ

ব্যবহার করা হতে পারে।


ঘরোয়া করণীয়

  • প্রতিদিন নিয়মিত ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করুন।

  • কুসুম গরম পানিতে অল্প সময় গোসল করুন।

  • সুগন্ধিযুক্ত সাবান ও প্রসাধনী এড়িয়ে চলুন।

  • নখ ছোট রাখুন যাতে চুলকিয়ে ত্বক ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।

  • সুতির (Cotton) পোশাক পরুন।

  • অতিরিক্ত গরম ও ঘাম এড়িয়ে চলুন।

  • মানসিক চাপ কমানোর চেষ্টা করুন।


কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?

নিচের যেকোনো একটি পরিস্থিতিতে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন—

  • তীব্র চুলকানি ঘুমে বাধা সৃষ্টি করলে

  • একজিমা বারবার ফিরে এলে

  • ত্বকে পুঁজ বা সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দিলে

  • স্টেরয়েড বা ময়েশ্চারাইজারে উন্নতি না হলে

  • শরীরের বড় অংশ আক্রান্ত হলে


সম্ভাব্য জটিলতা

চিকিৎসা না করলে হতে পারে—

  • ত্বকের ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ

  • ভাইরাসজনিত সংক্রমণ (যেমন Eczema Herpeticum)

  • স্থায়ী ত্বক মোটা হয়ে যাওয়া

  • ঘুমের সমস্যা

  • উদ্বেগ ও বিষণ্নতা

  • জীবনযাত্রার মান কমে যাওয়া


একজিমা প্রতিরোধের উপায়

  • নিয়মিত ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করুন।

  • ত্বক অতিরিক্ত শুষ্ক হতে দেবেন না।

  • পরিচিত ট্রিগার এড়িয়ে চলুন।

  • মৃদু, সুগন্ধিবিহীন ক্লিনজার ব্যবহার করুন।

  • ধুলাবালি ও অতিরিক্ত গরম পরিবেশ এড়িয়ে চলুন।

  • মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন।


প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

একজিমা কি সংক্রামক?

না। এটি একজনের থেকে আরেকজনের মধ্যে ছড়ায় না।

একজিমা কি পুরোপুরি ভালো হয়?

অনেক শিশুর ক্ষেত্রে বয়স বাড়ার সঙ্গে উপসর্গ কমে যায়। তবে অনেকের ক্ষেত্রে এটি দীর্ঘমেয়াদি রোগ হিসেবে থেকে যেতে পারে এবং নিয়মিত নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়।

স্টেরয়েড ক্রিম কি ক্ষতিকর?

চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সঠিক শক্তি ও নির্দিষ্ট সময় ব্যবহার করলে সাধারণত নিরাপদ। দীর্ঘদিন নিজের ইচ্ছামতো ব্যবহার করলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে।

একজিমা কি খাবারের কারণে হয়?

সব ক্ষেত্রে নয়। কিছু শিশু বা নির্দিষ্ট ব্যক্তির ক্ষেত্রে কিছু খাবার উপসর্গ বাড়াতে পারে। অপ্রয়োজনীয়ভাবে খাদ্যতালিকা থেকে অনেক খাবার বাদ দেওয়া উচিত নয়।

গোসল করলে কি একজিমা বাড়ে?

না। তবে দীর্ঘ সময় গরম পানিতে গোসল করলে ত্বক আরও শুষ্ক হতে পারে। কুসুম গরম পানিতে স্বল্প সময় গোসল করে পরে সঙ্গে সঙ্গে ময়েশ্চারাইজার লাগানো উচিত।


মূল বিষয়গুলো (Key Takeaways)

  • একজিমা একটি দীর্ঘমেয়াদি কিন্তু নিয়ন্ত্রণযোগ্য ত্বকের রোগ।

  • এটি সংক্রামক নয়।

  • নিয়মিত ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার চিকিৎসার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

  • ট্রিগার এড়িয়ে চলা ও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ ব্যবহার করলে অধিকাংশ রোগীর উপসর্গ ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।

  • সংক্রমণ, তীব্র চুলকানি বা বড় অংশ আক্রান্ত হলে দ্রুত চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।


তথ্যসূত্র

  • American Academy of Dermatology (AAD)

  • American Academy of Allergy, Asthma & Immunology (AAAAI)

  • European Academy of Dermatology and Venereology (EADV)

  • National Institute for Health and Care Excellence (NICE)

  • World Allergy Organization (WAO)


Medical Review

গুরুত্বপূর্ণ: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র স্বাস্থ্যশিক্ষার উদ্দেশ্যে প্রস্তুত করা হয়েছে। এটি চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। যদি একজিমার সঙ্গে সংক্রমণ, তীব্র চুলকানি, চোখের চারপাশে সমস্যা বা সাধারণ চিকিৎসায় উন্নতি না হয়, তাহলে দ্রুত একজন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

এই নিবন্ধটি আন্তর্জাতিক চিকিৎসা নির্দেশিকা (AAD, EADV, NICE ও WAO) এবং নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়মিত হালনাগাদ করা হয় যাতে পাঠক সর্বশেষ ও নির্ভরযোগ্য স্বাস্থ্যতথ্য পান।

Content prepared by: Doctors24 Editorial Team

Medical information is verified using registered doctor data and trusted healthcare sources

Information sources: Public records, hospital data, and provided credentials

Published At: August 7, 2026

Last updated: August 7, 2026 Read Editorial Policy →

Related Dermatologist Articles

View all →

Related Dermatologist Videos

View all →