/
শিশুর খিঁচুনির কারণ, মৃগী রোগের লক্ষণ, রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষা, চিকিৎসা এবং খিঁচুনির সময় জরুরি করণীয় সম্পর্কে জানুন।

শিশুর হঠাৎ হাত-পা কাঁপতে থাকা, শরীর শক্ত হয়ে যাওয়া, চোখ উল্টে যাওয়া বা কিছু সময়ের জন্য সাড়া না দেওয়া দেখে অভিভাবকেরা আতঙ্কিত হয়ে পড়তে পারেন। শিশুদের এমন অবস্থার একটি সম্ভাব্য কারণ হলো খিঁচুনি (Seizure)। তবে শিশুর খিঁচুনি হলেই যে মৃগী রোগ (Epilepsy) হয়েছে, তা নয়। জ্বর, রক্তে গ্লুকোজের ঘাটতি, মস্তিষ্কে সংক্রমণসহ বিভিন্ন কারণেও খিঁচুনি হতে পারে।
শিশুর খিঁচুনির কারণ নির্ণয়, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা এবং সঠিক চিকিৎসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে প্রথমবার খিঁচুনি হলে অথবা খিঁচুনি দীর্ঘ সময় স্থায়ী হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া উচিত।
শিশুর মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষে বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ সাময়িকভাবে অস্বাভাবিক হয়ে গেলে খিঁচুনি হতে পারে। খিঁচুনির কারণ শিশুর বয়স, জ্বরের উপস্থিতি, পূর্ববর্তী অসুস্থতা, জন্মের ইতিহাস এবং অন্যান্য উপসর্গের ওপর নির্ভর করে।
সাধারণত ৬ মাস থেকে ৫ বছরের শিশুদের জ্বরের সময় জ্বরজনিত খিঁচুনি হতে পারে। এ সময় শিশুর শরীর শক্ত হয়ে যাওয়া, হাত-পা কাঁপা, চোখ স্থির হয়ে যাওয়া বা সাময়িকভাবে সাড়া না দেওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
বেশির ভাগ সাধারণ জ্বরজনিত খিঁচুনি অল্প সময় স্থায়ী হয় এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করে না। তবে প্রথমবার এমন খিঁচুনি হলে চিকিৎসকের মাধ্যমে মূল্যায়ন করানো জরুরি, কারণ জ্বরের পেছনে গুরুতর সংক্রমণও থাকতে পারে।
মৃগী রোগ হলো মস্তিষ্কের একটি দীর্ঘমেয়াদি স্নায়বিক অবস্থা, যেখানে অস্বাভাবিক বৈদ্যুতিক কার্যকলাপের কারণে বারবার খিঁচুনি হতে পারে।
শিশুর মৃগী রোগের ক্ষেত্রে হাত-পা কাঁপা ছাড়াও কয়েক সেকেন্ডের জন্য তাকিয়ে থাকা, হঠাৎ সাড়া না দেওয়া, শরীরের কোনো অংশে ঝাঁকুনি বা অস্বাভাবিক অনুভূতি দেখা দিতে পারে।
সাধারণত সুস্পষ্ট প্ররোচনাকারী কারণ ছাড়া একাধিক খিঁচুনি হওয়া মৃগী রোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক। তবে কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে একটি খিঁচুনির পরও পরীক্ষার ফলাফল ও পুনরায় খিঁচুনির ঝুঁকি বিবেচনা করে রোগ নির্ণয় করা হতে পারে।
মস্তিষ্ক বা এর আবরণে সংক্রমণ হলে খিঁচুনি হতে পারে। সম্ভাব্য কারণের মধ্যে রয়েছে মেনিনজাইটিস (Meningitis) ও এনসেফালাইটিস (Encephalitis)। মাথায় গুরুতর আঘাতের পরও খিঁচুনি দেখা দিতে পারে।
খিঁচুনির সঙ্গে উচ্চ জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা, ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া, বারবার বমি, অস্বাভাবিক ঘুম ঘুম ভাব বা চেতনা কমে যাওয়া থাকলে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন।
জন্মের আগে, জন্মের সময় বা জন্মের পরপর মস্তিষ্কে অক্সিজেনের ঘাটতি কিংবা গুরুতর আঘাত হলে কিছু শিশুর পরবর্তীতে মৃগী রোগ হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে। কিছু জন্মগত মস্তিষ্কের গঠনগত সমস্যাও খিঁচুনির কারণ হতে পারে।
তবে জন্মের সময় অক্সিজেনের ঘাটতি হয়েছে বলেই শিশুর মৃগী রোগ হবেই, এমন নয়। আবার অনেক শিশুর ক্ষেত্রে খিঁচুনির নির্দিষ্ট কারণ শনাক্ত করা সম্ভব হয় না।
রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা অতিরিক্ত কমে গেলে অথবা সোডিয়াম ও ক্যালসিয়ামের মতো ইলেকট্রোলাইটের গুরুতর ভারসাম্যহীনতা হলে শিশুর খিঁচুনি হতে পারে।
এ ধরনের ক্ষেত্রে অন্তর্নিহিত সমস্যাটি দ্রুত শনাক্ত করে চিকিৎসা করা জরুরি।
কিছু জিনগত পরিবর্তন, জন্মগত মস্তিষ্কের অস্বাভাবিকতা এবং নির্দিষ্ট স্নায়বিক রোগের সঙ্গে মৃগী রোগের সম্পর্ক রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে পারিবারিক ইতিহাসও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
তবে পরিবারে মৃগী রোগ থাকলেই শিশুর এই রোগ হবে, এমন নয়।
শিশুর মৃগী রোগের লক্ষণ খিঁচুনির ধরন ও মস্তিষ্কের কোন অংশ আক্রান্ত হচ্ছে তার ওপর নির্ভর করে। সব শিশুর ক্ষেত্রে হাত-পা কাঁপা বা জ্ঞান হারানোর মতো লক্ষণ দেখা যায় না।
শিশুর শরীর হঠাৎ শক্ত হয়ে যেতে পারে এবং হাত-পা ছন্দময়ভাবে কাঁপতে পারে। কখনো শরীরের এক পাশেও এমন নড়াচড়া হতে পারে।
কিছু খিঁচুনিতে শিশু অচেতন হয়ে পড়তে পারে এবং ডাকলে বা কথা বললে সাড়া নাও দিতে পারে।
শিশু কয়েক সেকেন্ডের জন্য একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে পারে, কথা বলা বন্ধ করে দিতে পারে অথবা সাময়িকভাবে আশপাশের বিষয়ে সচেতনতা হারাতে পারে। বারবার এমন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
কোনো কোনো খিঁচুনিতে হাত, পা বা মুখের এক পাশ কাঁপতে পারে। কখনো অস্বাভাবিক নড়াচড়া শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
কিছু শিশু হঠাৎ অস্বাভাবিক অনুভূতি, অকারণ ভয়, অস্বাভাবিক নড়াচড়া বা আচরণ প্রদর্শন করতে পারে। এসব লক্ষণ একা মৃগী রোগ নিশ্চিত করে না; চিকিৎসকের মূল্যায়ন প্রয়োজন।
খিঁচুনি শেষ হওয়ার পর শিশু কিছু সময়ের জন্য ঘুম ঘুম ভাব, ক্লান্তি, বিভ্রান্তি বা মাথাব্যথা অনুভব করতে পারে। তবে দীর্ঘ সময় স্বাভাবিক চেতনা ফিরে না এলে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন।
না। একবার খিঁচুনি হওয়া মানেই মৃগী রোগ নয়। জ্বরজনিত খিঁচুনি, রক্তে গ্লুকোজের ঘাটতি, সংক্রমণ বা অন্যান্য সাময়িক সমস্যার কারণেও খিঁচুনি হতে পারে।
একবারের খিঁচুনি কোনো সাময়িক কারণের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। অন্যদিকে, মৃগী রোগে সাধারণত সুস্পষ্ট প্ররোচনাকারী কারণ ছাড়া বারবার খিঁচুনি হয় অথবা চিকিৎসকের মূল্যায়নে পুনরায় খিঁচুনির উচ্চ ঝুঁকি শনাক্ত হয়।
সঠিক পার্থক্য নির্ণয়ের জন্য শিশুর উপসর্গ, শারীরিক পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষার ফলাফল বিবেচনা করা হয়।
জ্বরের সঙ্গে সম্পর্কিত খিঁচুনিকে জ্বরজনিত খিঁচুনি বলা হয়। এটি সাধারণত ছোট শিশুদের মধ্যে দেখা যায় এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে মৃগী রোগের সমতুল্য নয়।
তবে প্রথমবার জ্বরজনিত খিঁচুনি হলে শিশুকে চিকিৎসকের মাধ্যমে মূল্যায়ন করানো উচিত।
নিচের লক্ষণগুলোর সঙ্গে খিঁচুনি হলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে:
তীব্র জ্বরের সঙ্গে ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া।
শিশুর চেতনা কমে যাওয়া বা দীর্ঘ সময় অস্বাভাবিক ঘুম ঘুম ভাব থাকা।
শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া বা ঠোঁট নীলচে হয়ে যাওয়া।
মাথায় গুরুতর আঘাতের পর খিঁচুনি হওয়া।
শরীরের এক পাশ দুর্বল হয়ে যাওয়া।
বারবার খিঁচুনি হওয়া এবং মাঝখানে স্বাভাবিক চেতনা ফিরে না আসা।
খিঁচুনি সাধারণত শুরু হওয়ার ধরন ও মস্তিষ্কে এর বিস্তারের ভিত্তিতে বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করা হয়।
Focal Seizure মস্তিষ্কের একটি নির্দিষ্ট অংশে শুরু হয়। এতে শিশুর শরীরের এক পাশ কাঁপতে পারে, অস্বাভাবিক অনুভূতি হতে পারে অথবা কিছু সময়ের জন্য সচেতনতা কমে যেতে পারে।
Generalized Seizure শুরু থেকেই মস্তিষ্কের দুই পাশের নেটওয়ার্ককে প্রভাবিত করে। এর কোনো কোনো ধরনে শিশুর পুরো শরীর শক্ত হয়ে কাঁপতে পারে বা সাময়িকভাবে চেতনা হারাতে পারে।
খিঁচুনির ধরন শনাক্ত করা রোগ নির্ণয় ও উপযুক্ত চিকিৎসা নির্বাচনে সাহায্য করে। সব ধরনের খিঁচুনির চিকিৎসা এক নয়। তাই শিশুর লক্ষণ ও পরীক্ষার ফলাফল অনুযায়ী চিকিৎসা পরিকল্পনা করা হয়।
শিশুর খিঁচুনির কারণ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসক প্রথমে শিশুর উপসর্গ, খিঁচুনির সময়কাল, জ্বরের উপস্থিতি, জন্মের ইতিহাস এবং পারিবারিক ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারেন।
চিকিৎসক জানতে চাইতে পারেন:
খিঁচুনি কখন শুরু হয়েছে এবং কতক্ষণ স্থায়ী হয়েছে।
খিঁচুনির আগে জ্বর বা অন্য কোনো উপসর্গ ছিল কি না।
শিশুর জ্ঞান ছিল কি না এবং শরীরের কোন অংশ কেঁপেছে।
খিঁচুনির পর শিশু কত দ্রুত স্বাভাবিক হয়েছে।
আগে এমন ঘটনা ঘটেছে কি না।
সম্ভব হলে খিঁচুনির প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ বা নিরাপদে ধারণ করা ভিডিও চিকিৎসককে দেখানো সহায়ক হতে পারে। তবে ভিডিও করার জন্য শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বা জরুরি চিকিৎসা নিতে দেরি করা যাবে না।
EEG (Electroencephalogram) হলো এমন একটি পরীক্ষা, যার মাধ্যমে মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ রেকর্ড করা হয়। এটি খিঁচুনির ধরন ও মৃগী রোগের সম্ভাব্য শ্রেণি নির্ণয়ে সাহায্য করতে পারে।
তবে EEG স্বাভাবিক হলেই মৃগী রোগ সম্পূর্ণভাবে বাদ দেওয়া যায় না। পরীক্ষার ফলাফল শিশুর উপসর্গ ও চিকিৎসকের মূল্যায়নের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হয়।
MRI বা CT Scan-এর মাধ্যমে মস্তিষ্কের গঠনগত সমস্যা, আঘাত বা অন্যান্য অস্বাভাবিকতা শনাক্ত করা যেতে পারে।
সব শিশুর ক্ষেত্রে একই পরীক্ষা প্রয়োজন হয় না। শিশুর বয়স, খিঁচুনির ধরন, শারীরিক পরীক্ষার ফলাফল এবং সম্ভাব্য কারণ অনুযায়ী চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নেন।
রক্তে গ্লুকোজ, ইলেকট্রোলাইট বা সংক্রমণের মতো সমস্যার সন্দেহ থাকলে রক্ত পরীক্ষা করা হতে পারে। কোন পরীক্ষা প্রয়োজন হবে, তা শিশুর অবস্থা অনুযায়ী নির্ধারণ করা হয়।
শিশুর মৃগী রোগের চিকিৎসা নির্ভর করে খিঁচুনির ধরন, শিশুর বয়স, রোগের কারণ এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যগত অবস্থার ওপর।
মৃগী রোগের প্রধান চিকিৎসা হলো চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খিঁচুনি নিয়ন্ত্রণের ওষুধ (Antiseizure Medication) গ্রহণ করা। সঠিক ওষুধ ও নিয়মিত চিকিৎসার মাধ্যমে অনেক শিশুর খিঁচুনি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
কোন ওষুধ, কত মাত্রায় এবং কতবার দিতে হবে, তা শিশুর চিকিৎসক নির্ধারণ করবেন। নিজের সিদ্ধান্তে ওষুধ শুরু, পরিবর্তন বা বন্ধ করা উচিত নয়।
নির্ধারিত সময়ে ওষুধ খাওয়া খিঁচুনি নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। বারবার ওষুধ বাদ পড়লে খিঁচুনি ফিরে আসতে পারে।
শিশুর ওষুধ শেষ হয়ে যাওয়ার আগেই নতুন ওষুধের ব্যবস্থা করা এবং ফলো-আপের সময় চিকিৎসকের সঙ্গে চিকিৎসার ফলাফল আলোচনা করা গুরুত্বপূর্ণ।
এটি নির্দিষ্ট ওষুধের ওপর নির্ভর করে। কিছু ওষুধ খাবারের সঙ্গে, আবার কিছু ওষুধ খাবারের আগে বা পরে নেওয়ার নির্দেশনা থাকতে পারে।
ওষুধের লেবেল, প্যাকেটের নির্দেশনা বা চিকিৎসক ও ফার্মাসিস্টের পরামর্শ অনুসরণ করুন। সব খিঁচুনির ওষুধের জন্য একই নিয়ম প্রযোজ্য নয়।
করণীয় ওষুধভেদে আলাদা হতে পারে। ওষুধের নির্দেশনা অনুসরণ করুন অথবা চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের পরামর্শ নিন। ভুলে যাওয়া ডোজের পরিবর্তে নিজে থেকে দ্বিগুণ ডোজ দেবেন না।
সঠিকভাবে ওষুধ ব্যবহারের পরও খিঁচুনি চলতে থাকলে চিকিৎসক রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা পরিকল্পনা পুনর্মূল্যায়ন করতে পারেন। নির্বাচিত ক্ষেত্রে একাধিক ওষুধ, বিশেষায়িত খাদ্যভিত্তিক চিকিৎসা, Vagus Nerve Stimulation (VNS) অথবা Epilepsy Surgery বিবেচনা করা হতে পারে।
এসব চিকিৎসা সব শিশুর জন্য উপযুক্ত নয়। বিশেষজ্ঞের মূল্যায়নের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
মৃগী রোগের ওষুধ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত শিশুর রোগের ধরন, খিঁচুনির ইতিহাস, EEG-এর ফলাফল এবং পুনরায় খিঁচুনি হওয়ার ঝুঁকি বিবেচনা করে নিতে হয়।
কিছু শিশুর ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় খিঁচুনি না হলে ওষুধ বন্ধ করার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। অনেক নির্দেশিকায় অন্তত দুই বছর খিঁচুনিমুক্ত থাকার পর ব্যক্তিভিত্তিক ঝুঁকি মূল্যায়নের কথা বলা হয়েছে। তবে দুই বছর খিঁচুনি না হলেই সব শিশুর ওষুধ বন্ধ করা নিরাপদ—এমন নয়।
EEG-তে অস্বাভাবিকতা, মৃগী রোগের নির্দিষ্ট ধরন, অন্তর্নিহিত মস্তিষ্কের সমস্যা এবং পূর্ববর্তী খিঁচুনির ইতিহাস পুনরায় খিঁচুনি হওয়ার ঝুঁকিকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই ওষুধ বন্ধের আগে চিকিৎসক এসব বিষয় মূল্যায়ন করেন।
হঠাৎ ওষুধ বন্ধ করলে খিঁচুনি ফিরে আসতে পারে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে গুরুতর বা দীর্ঘস্থায়ী খিঁচুনি হতে পারে। ওষুধ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত হলে চিকিৎসকের পরিকল্পনা অনুযায়ী ধীরে ধীরে মাত্রা কমাতে হয়।
শিশুর খিঁচুনি চলাকালে শান্ত থাকার চেষ্টা করুন এবং শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন।
শিশুকে মেঝের মতো নিরাপদ, সমতল জায়গায় রাখুন।
আশপাশের শক্ত, ধারালো বা বিপজ্জনক বস্তু সরিয়ে দিন।
সম্ভব হলে শিশুকে আলতোভাবে এক পাশে কাত করে রাখুন, বিশেষত খিঁচুনি থামার পর।
গলার আঁটসাঁট পোশাক ঢিলা করুন।
খিঁচুনি শুরু হওয়ার সময় লক্ষ্য করুন এবং কতক্ষণ স্থায়ী হচ্ছে তা হিসাব করুন।
খিঁচুনি থামার পর শিশুর শ্বাসপ্রশ্বাস ও চেতনা পর্যবেক্ষণ করুন।
শিশুর মুখে চামচ, আঙুল বা অন্য কোনো বস্তু ঢোকাবেন না।
পানি, খাবার বা মুখে খাওয়ার ওষুধ দেবেন না।
জোর করে হাত-পা চেপে ধরে কাঁপুনি থামানোর চেষ্টা করবেন না।
শিশুকে ঝাঁকাবেন না বা জোর করে ধরে রাখবেন না।
খিঁচুনি চলাকালে শিশুকে একা ফেলে যাবেন না।
নিচের যেকোনো পরিস্থিতিতে জরুরি চিকিৎসা নিন:
শিশুর জীবনে প্রথমবার খিঁচুনি হলে।
খিঁচুনি পাঁচ মিনিট বা তার বেশি স্থায়ী হলে।
একটির পর একটি খিঁচুনি হলে এবং মাঝখানে স্বাভাবিক চেতনা ফিরে না এলে।
শ্বাস নিতে সমস্যা হলে বা খিঁচুনি থামার পরও চেতনা ফিরে না এলে।
খিঁচুনির সময় গুরুতর আঘাত লাগলে।
খিঁচুনির সঙ্গে গুরুতর সংক্রমণ বা অন্য বিপজ্জনক উপসর্গ দেখা দিলে।
শিশুর আগে থেকে নির্ধারিত জরুরি চিকিৎসা পরিকল্পনা থাকলে সেটি অনুসরণ করুন। প্রশিক্ষণ ও চিকিৎসকের নির্দেশনা ছাড়া জরুরি ওষুধ প্রয়োগ করবেন না।
মৃগী রোগ থাকা মানেই শিশুর বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ বা পড়াশোনায় সমস্যা হবে, এমন নয়। অনেক শিশু নিয়মিত চিকিৎসা নিয়ে স্বাভাবিকভাবে পড়াশোনা ও দৈনন্দিন কাজ চালিয়ে যেতে পারে।
কিছু শিশুর ক্ষেত্রে খিঁচুনির ধরন, ঘন ঘন খিঁচুনি, অন্তর্নিহিত স্নায়বিক সমস্যা অথবা ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি বা শেখার ক্ষেত্রে অসুবিধা হতে পারে।
এ ধরনের সমস্যা দেখা দিলে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত। প্রয়োজন অনুযায়ী বিকাশ মূল্যায়ন, শিক্ষাগত সহায়তা বা অন্যান্য বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে।
নিয়মিত চিকিৎসা, পর্যাপ্ত ঘুম, নির্ধারিত ওষুধ গ্রহণ এবং ফলো-আপ খিঁচুনি নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। শিশুকে অযথা খেলাধুলা, পড়াশোনা বা সামাজিক কার্যক্রম থেকে বিচ্ছিন্ন না রেখে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিরাপদ অংশগ্রহণে উৎসাহিত করুন।
শিশুর শিক্ষক বা স্কুল কর্তৃপক্ষকে খিঁচুনির লক্ষণ, প্রাথমিক সহায়তা এবং কখন জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে তা জানিয়ে রাখা ভালো। শিশুর ব্যক্তিগত চিকিৎসা পরিকল্পনা থাকলে তা স্কুলের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া যেতে পারে।
অনেক শিশুর ক্ষেত্রে উপযুক্ত ওষুধ ও নিয়মিত চিকিৎসার মাধ্যমে খিঁচুনি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তবে ফলাফল রোগের ধরন ও কারণের ওপর নির্ভর করে। কিছু শিশুর দীর্ঘমেয়াদি বিশেষায়িত চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।
কিছু ধরনের মৃগী রোগের সঙ্গে জিনগত কারণের সম্পর্ক রয়েছে। তবে সব মৃগী রোগ বংশগত নয়। পারিবারিক ইতিহাস থাকলেও শিশুর রোগ হবেই, এমন নয়।
বেশির ভাগ শিশুর জ্বরজনিত খিঁচুনি থেকে মৃগী রোগ হয় না। তবে কিছু নির্দিষ্ট ঝুঁকির ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে মৃগী রোগের সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি হতে পারে। শিশুর খিঁচুনির ধরন ও চিকিৎসা মূল্যায়নের ভিত্তিতে ঝুঁকি নির্ধারণ করা হয়।
ওষুধ কতদিন খেতে হবে তা শিশুর রোগের ধরন, খিঁচুনি নিয়ন্ত্রণের অবস্থা, EEG এবং পুনরায় খিঁচুনির ঝুঁকির ওপর নির্ভর করে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বন্ধ করা উচিত নয়।
প্রথমবার খিঁচুনি হলে শিশুকে দ্রুত চিকিৎসকের মাধ্যমে মূল্যায়ন করানো উচিত। প্রাথমিক মূল্যায়নের জন্য শিশু বিশেষজ্ঞ (Child Specialist) সাহায্য করতে পারেন। বারবার খিঁচুনি, মৃগী রোগের সন্দেহ, জটিল উপসর্গ বা চিকিৎসায় নিয়ন্ত্রণ না এলে শিশু স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ (Pediatric Neurologist)-এর পরামর্শ নেওয়া উপযুক্ত।
জ্বরজনিত খিঁচুনি (Febrile Seizure)
মৃগী রোগ (Epilepsy)
EEG পরীক্ষা কী?
শিশুদের বিকাশে বিলম্ব
শিশুদের মস্তিষ্কের সংক্রমণ
শিশুদের মাথায় আঘাত
শিশুদের স্নায়বিক রোগ
এই নিবন্ধটি স্বাস্থ্যশিক্ষার উদ্দেশ্যে তৈরি। এটি চিকিৎসকের পরামর্শ, রোগ নির্ণয় বা চিকিৎসার বিকল্প নয়। শিশুর প্রথমবার খিঁচুনি হলে, খিঁচুনি পাঁচ মিনিট বা তার বেশি স্থায়ী হলে, শ্বাসকষ্ট হলে অথবা চেতনা ফিরে না এলে জরুরি চিকিৎসা নিন। শিশুর উপসর্গ ও অবস্থা অনুযায়ী নিবন্ধিত চিকিৎসক বা Pediatric Neurologist-এর পরামর্শ নিন।
Content Source: Doctors24 Official YouTube Channel
Medical Expert Featured: অধ্যাপক ডাঃ সেহেলী জাহান, এমবিবিএস, এমডি (নিউরোলজি), স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ, অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, নিউরোলজি বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, ঢাকা
Content Prepared & Published By: Doctors24 Editorial Team
Last Updated: 9 October 2026 • Read Editorial Policy →
Connect with experienced neurologist near you for consultation and treatment.