হার্নিয়ার কারণ, লক্ষণ, Mesh Repair, Laparoscopic Surgery ও বিশেষজ্ঞের পরামর্শ

হার্নিয়া (Hernia) একটি সাধারণ সার্জিক্যাল সমস্যা, যেখানে শরীরের কোনো অঙ্গ বা চর্বিযুক্ত টিস্যু পেশির দুর্বল অংশ বা ফাঁক দিয়ে বাইরে দিকে ফুলে আসে। এটি সবচেয়ে বেশি কুচকি (Groin), নাভি (Umbilicus) এবং অপারেশনের পুরোনো কাটা স্থানে দেখা যায়।
অনেকেই মনে করেন হার্নিয়া ওষুধ বা বেল্ট ব্যবহার করে স্থায়ীভাবে ভালো হয়ে যায়। বাস্তবে হার্নিয়ার স্থায়ী চিকিৎসা হলো অপারেশন। তবে সব রোগীর ক্ষেত্রে একই সময়ে বা একই ধরনের অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হয় না। রোগীর বয়স, হার্নিয়ার ধরন, উপসর্গ এবং সামগ্রিক শারীরিক অবস্থার ওপর চিকিৎসা নির্ভর করে।
এই ভিডিওতে জেনারেল সার্জারি বিশেষজ্ঞ ডাঃ রাইসুল ইসলাম হার্নিয়ার কারণ, লক্ষণ, বিভিন্ন ধরন, ল্যাপারোস্কোপিক ও ওপেন অপারেশনের পার্থক্য, Mesh Repair এবং কখন জরুরি অপারেশন প্রয়োজন—এসব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।
হার্নিয়া হলো এমন একটি অবস্থা, যেখানে পেশির দুর্বল অংশ দিয়ে ভেতরের টিস্যু বা অঙ্গ বাইরে দিকে স্ফীত হয়ে আসে।
পেটের পেশি বা সংযোজক টিস্যু (Connective Tissue) দুর্বল হয়ে গেলে ভেতরের চাপের কারণে টিস্যু বাইরে বেরিয়ে আসে এবং হার্নিয়া তৈরি হয়।
হার্নিয়ার সাধারণ স্থানগুলো হলো:
কুচকি (Inguinal Region)
নাভি (Umbilicus)
উরুর উপরের অংশ (Femoral Region)
পূর্বের অপারেশনের কাটা স্থান (Incisional Hernia)
কুচকিতে বা নাভির আশপাশে একটি ফোলা অংশ দেখা যেতে পারে।
বিশেষ করে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা বা হাঁটার সময় অস্বস্তি বা ভারী লাগতে পারে।
কাশি, হাঁচি বা ভারী জিনিস তুললে ফোলা অংশ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।
প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক হার্নিয়া শুয়ে পড়লে বা হালকা চাপ দিলে ভেতরে চলে যেতে পারে।
কিছু মানুষের জন্মগতভাবেই পেশির একটি অংশ দুর্বল থাকে।
দীর্ঘদিন বা বারবার ভারী ওজন তুললে পেটের ভেতরের চাপ বেড়ে হার্নিয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
দীর্ঘস্থায়ী কাশি পেটের ভেতরের চাপ বাড়ায়।
মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ দেওয়াও ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
অতিরিক্ত ওজন পেটের দেয়ালে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।
এছাড়াও ঝুঁকি বাড়তে পারে:
ধূমপান
গর্ভাবস্থা
পূর্বের পেটের অপারেশন
বয়সজনিত পেশির দুর্বলতা
এটি সবচেয়ে সাধারণ হার্নিয়া, যা কুচকির অংশে হয় এবং পুরুষদের মধ্যে বেশি দেখা যায়।
নাভির চারপাশে ফুলে যাওয়া দেখা যায়। শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক উভয়েরই হতে পারে।
এটি তুলনামূলক কম হলেও নারীদের মধ্যে বেশি দেখা যায় এবং জটিলতার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হতে পারে।
বর্তমানে কোনো ওষুধ হার্নিয়ার ছিদ্র বা পেশির দুর্বলতা স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে পারে না। তাই অস্ত্রোপচারই স্থায়ী সমাধান।
কিছু ছোট, উপসর্গবিহীন হার্নিয়ার ক্ষেত্রে চিকিৎসক নিয়মিত পর্যবেক্ষণের পরামর্শ দিতে পারেন। তবে উপসর্গ বাড়লে বা জটিলতার ঝুঁকি থাকলে অস্ত্রোপচার বিবেচনা করা হয়।
হার্নিয়ার ভেতরে আটকে থাকা অন্ত্রে রক্ত সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে এটিকে Strangulated Hernia বলা হয়। এটি জরুরি অস্ত্রোপচারের বিষয়।
অন্ত্র আটকে গেলে বমি, পেট ফাঁপা এবং পায়খানা বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
নিম্নোক্ত পরিস্থিতিতে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন:
হার্নিয়া হঠাৎ শক্ত হয়ে গেলে
তীব্র ব্যথা হলে
বমি শুরু হলে
পায়খানা বা গ্যাস বন্ধ হয়ে গেলে
ফোলা অংশ ভেতরে না গেলে
অভিজ্ঞ সার্জন অধিকাংশ ক্ষেত্রে শারীরিক পরীক্ষার মাধ্যমেই হার্নিয়া নির্ণয় করতে পারেন।
কিছু ক্ষেত্রে হার্নিয়া নিশ্চিত করতে বা অন্যান্য সমস্যা মূল্যায়নে Ultrasound করা হতে পারে।
জটিল হার্নিয়া, পুনরায় হওয়া হার্নিয়া বা নির্ণয়ে সন্দেহ থাকলে CT Scan প্রয়োজন হতে পারে।
প্রচলিত পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট স্থানে কাটা দিয়ে হার্নিয়া মেরামত করা হয়।
ছোট ছিদ্র দিয়ে ক্যামেরা ও বিশেষ যন্ত্রের সাহায্যে অপারেশন করা হয়। নির্বাচিত রোগীদের জন্য এটি একটি আধুনিক ও কার্যকর পদ্ধতি।
অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্ক হার্নিয়া অপারেশনে একটি বিশেষ Surgical Mesh ব্যবহার করা হয়, যা দুর্বল অংশকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করে এবং পুনরায় হার্নিয়া হওয়ার ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে।
নির্বাচিত রোগীদের ক্ষেত্রে ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারির পর তুলনামূলক কম ব্যথা এবং ছোট ক্ষত থাকতে পারে। তবে ব্যক্তিভেদে অভিজ্ঞতা ভিন্ন হতে পারে।
কাজে ফেরার সময় নির্ভর করে:
অপারেশনের ধরন
রোগীর শারীরিক অবস্থা
কাজের ধরন
চিকিৎসকের পরামর্শ
হালকা কাজে তুলনামূলক দ্রুত ফেরা সম্ভব হলেও ভারী শারীরিক কাজ শুরু করার আগে চিকিৎসকের অনুমতি নেওয়া উচিত।
সব রোগীর জন্য একই পদ্ধতি উপযুক্ত নয়। হার্নিয়ার ধরন, আকার, পূর্বের অপারেশন, অন্যান্য রোগ এবং সার্জনের মূল্যায়নের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী যত দ্রুত সম্ভব হালকা হাঁটাচলা শুরু করা উপকারী হতে পারে।
ভারী ওজন তোলা বা কঠিন শারীরিক কাজ শুরু করার আগে অবশ্যই সার্জনের পরামর্শ অনুসরণ করুন।
পর্যাপ্ত আঁশযুক্ত খাবার খান।
কোষ্ঠকাঠিন্য এড়িয়ে চলুন।
পর্যাপ্ত পানি পান করুন।
ধূমপান ত্যাগ করুন।
ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
হার্নিয়া অপারেশনের খরচ নির্দিষ্ট নয় এবং বিভিন্ন বিষয়ের ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হতে পারে।
অপারেশনের ব্যয় নির্ভর করতে পারে:
হার্নিয়ার ধরন
ওপেন নাকি ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারি
Mesh-এর ধরন
হাসপাতালের সুযোগ-সুবিধা
সার্জনের অভিজ্ঞতা
রোগীর জটিলতা
হাসপাতালে থাকার সময়
সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের সেবা, সুবিধা, ব্যবহৃত প্রযুক্তি এবং অন্যান্য খরচের কারণে ব্যয়ের পার্থক্য হতে পারে। নির্দিষ্ট খরচ জানতে সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল বা চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত।
হার্নিয়া শক্ত হয়ে গেলে এবং ভেতরে না গেলে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন।
ক্রমাগত ব্যথা বা নতুন ব্যথা শুরু হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
এটি অন্ত্র আটকে যাওয়ার লক্ষণ হতে পারে এবং জরুরি অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে।
এছাড়াও দ্রুত চিকিৎসা নিন যদি:
জ্বর আসে
ফোলা অংশের রং পরিবর্তন হয়
হার্নিয়া দ্রুত বড় হতে থাকে
না। হার্নিয়া সাধারণত নিজে থেকে ভালো হয় না এবং সময়ের সঙ্গে বড় হতে পারে।
না। বর্তমানে কোনো ওষুধ হার্নিয়ার স্থায়ী চিকিৎসা নয়।
অধিকাংশ হার্নিয়া অপারেশন নিয়মিত করা হয় এবং অভিজ্ঞ সার্জনের মাধ্যমে সাধারণত নিরাপদভাবে সম্পন্ন করা যায়। তবে সব অস্ত্রোপচারের মতোই কিছু ঝুঁকি থাকতে পারে।
কোনটি ভালো হবে তা রোগীর অবস্থা, হার্নিয়ার ধরন এবং সার্জনের মূল্যায়নের ওপর নির্ভর করে।
এটি রোগী ও অপারেশনের ধরন অনুযায়ী ভিন্ন হয়। চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুসরণ করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
হ্যাঁ। কিছু ক্ষেত্রে পুনরায় হার্নিয়া হতে পারে, যদিও আধুনিক Mesh Repair-এর মাধ্যমে এই ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
হালকা শারীরিক কার্যক্রম অনেক ক্ষেত্রে করা যায়, তবে ভারী ব্যায়াম বা ওজন তোলার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
না। হার্নিয়া ক্যান্সার নয় এবং এটি ক্যান্সারে রূপান্তরিত হয় না।
কুচকি বা নাভির কাছে কোনো অস্বাভাবিক ফোলা অংশ, ব্যথা বা ভারী লাগার অনুভূতি হলে এটিকে অবহেলা করবেন না। প্রাথমিক পর্যায়ে হার্নিয়া নির্ণয় ও পরিকল্পিত অস্ত্রোপচার করলে জটিলতার ঝুঁকি অনেক কম থাকে। তবে হার্নিয়া হঠাৎ শক্ত হয়ে গেলে, তীব্র ব্যথা, বমি বা পায়খানা বন্ধ হয়ে গেলে এটি জরুরি অবস্থা—সেক্ষেত্রে দ্রুত হাসপাতালে যান।
Content Source: Doctors24 Official YouTube Channel
Medical Expert Featured: ডাঃ রাইসুল ইসলাম, এমবিবিএস, এমএস (সার্জারী), ডিপ্লোমা এন্ড ফেলোশিপ ইন মিনিমাল এসেস সার্জারী (দিল্লী, ভারত), জেনারেল, লেপারোস্কোপিক ও কলোরেক্টাল সার্জন, জেনারেল সার্জারী বিশেষজ্ঞ, সহযোগী অধ্যাপক (সার্জারী বিভাগ) শহীদ মুনসুর আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।
Content Prepared & Published By: Doctors24 Editorial Team
Last Updated: 16 July 2026 • Read Editorial Policy →
Connect with experienced general surgeon near you for consultation and treatment.