মেছতা (Melasma): কারণ, লক্ষণ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধ

Doctors24 Editorial TeamJuly 30, 2026
মেছতা (Melasma): কারণ, লক্ষণ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধ
Key Overview

"মেছতা (Melasma) হলো ত্বকের একটি সাধারণ রঞ্জকতা (Pigmentation) সমস্যা, যেখানে মুখে বাদামি, ধূসর-বাদামি বা গাঢ় রঙের দাগ তৈরি হয়। এটি সংক্রামক নয়, ক্যান্সারও নয..."

মেছতা (Melasma) হলো ত্বকের একটি সাধারণ রঞ্জকতা (Pigmentation) সমস্যা, যেখানে মুখে বাদামি, ধূসর-বাদামি বা গাঢ় রঙের দাগ তৈরি হয়। এটি সংক্রামক নয়, ক্যান্সারও নয় এবং সাধারণত শারীরিকভাবে ক্ষতিকর নয়। তবে এটি সৌন্দর্য ও আত্মবিশ্বাসে প্রভাব ফেলতে পারে।

মেছতা নারীদের মধ্যে বেশি দেখা যায়, বিশেষ করে গর্ভাবস্থা, জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি ব্যবহার বা অতিরিক্ত সূর্যালোকের সংস্পর্শে আসার পর। সঠিক চিকিৎসা ও সূর্য থেকে সুরক্ষার মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রে দাগ উল্লেখযোগ্যভাবে হালকা করা সম্ভব, যদিও পুনরায় হওয়ার ঝুঁকি থাকে।


মেছতা (Melasma) কী?

মেছতা হলো এমন একটি অবস্থা, যেখানে ত্বকের মেলানোসাইট (Melanocytes) অতিরিক্ত মেলানিন (Melanin) তৈরি করে। এর ফলে মুখের নির্দিষ্ট স্থানে সমানভাবে ছড়িয়ে থাকা গাঢ় দাগ দেখা যায়।

সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত স্থানগুলো হলো—

  • দুই গাল

  • কপাল

  • নাকের ওপরের অংশ

  • উপরের ঠোঁট

  • থুতনি


সংক্ষেপে (Quick Facts)

বিষয়

তথ্য

চিকিৎসা নাম

Melasma

প্রধান লক্ষণ

মুখে বাদামি বা ধূসর-বাদামি দাগ

সবচেয়ে সাধারণ কারণ

সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি (UV), হরমোনের পরিবর্তন

সংক্রামক?

না

কোন বিশেষজ্ঞ দেখাবেন

চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ (Dermatologist)

🚨 কখন চিকিৎসকের কাছে দ্রুত যাবেন?

মেছতা সাধারণত জরুরি সমস্যা নয়। তবে নিচের যেকোনো লক্ষণ থাকলে দ্রুত চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন—

  • দাগের রঙ, আকৃতি বা আকার দ্রুত পরিবর্তন হওয়া

  • দাগে রক্তপাত, ঘা বা ব্যথা হওয়া

  • একটি দাগ অন্যগুলোর তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন দেখানো

এসব ক্ষেত্রে অন্য ত্বকের রোগ বা ত্বকের ক্যান্সার আছে কি না তা মূল্যায়ন করা প্রয়োজন হতে পারে।


মেছতার কারণ

মেছতার সঠিক কারণ পুরোপুরি জানা যায়নি। তবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে—

১. সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি (UV Radiation)

এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ। সূর্যের আলো মেলানিন উৎপাদন বাড়িয়ে মেছতা তৈরি বা বাড়িয়ে দিতে পারে।

২. হরমোনের পরিবর্তন

  • গর্ভাবস্থা (Pregnancy)

  • জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি

  • হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি (HRT)

৩. জিনগত কারণ

পরিবারের অন্য সদস্যের মেছতা থাকলে ঝুঁকি বাড়ে।

৪. কিছু প্রসাধনী

কিছু সুগন্ধি বা প্রসাধনী সূর্যালোকের সঙ্গে প্রতিক্রিয়া করে রঞ্জকতা বাড়াতে পারে।

৫. কিছু ওষুধ

কিছু ওষুধ সূর্যালোকের প্রতি ত্বককে বেশি সংবেদনশীল করতে পারে।


ঝুঁকির কারণ

  • নারী হওয়া

  • ২০–৫০ বছর বয়স

  • গাঢ় ত্বকের রঙ (Skin Type III–V)

  • অতিরিক্ত রোদে থাকা

  • গর্ভাবস্থা

  • পরিবারের ইতিহাস

  • হরমোনজাতীয় ওষুধ ব্যবহার


লক্ষণ

মেছতার প্রধান লক্ষণ হলো—

  • মুখে সমানভাবে ছড়িয়ে থাকা বাদামি বা ধূসর-বাদামি দাগ

  • সাধারণত ব্যথা বা চুলকানি থাকে না

  • দাগের কিনারা তুলনামূলক স্পষ্ট

  • রোদে গেলে দাগ আরও গাঢ় হয়ে যেতে পারে


মেছতার ধরন

১. Epidermal Melasma

  • ত্বকের উপরের স্তরে রঞ্জকতা

  • চিকিৎসায় তুলনামূলক ভালো সাড়া দেয়

২. Dermal Melasma

  • ত্বকের গভীর স্তরে রঞ্জকতা

  • চিকিৎসায় বেশি সময় লাগে

৩. Mixed Melasma

  • দুই ধরনের বৈশিষ্ট্যই থাকে

  • সবচেয়ে সাধারণ ধরন


কীভাবে রোগ নির্ণয় করা হয়?

চিকিৎসকের মূল্যায়ন

  • দাগের অবস্থান ও রঙ

  • সূর্যের সংস্পর্শের ইতিহাস

  • গর্ভাবস্থা বা ওষুধের ইতিহাস

প্রয়োজনীয় পরীক্ষা

সাধারণত অতিরিক্ত পরীক্ষা লাগে না।

প্রয়োজনে—

  • Wood's Lamp Examination

  • Dermoscopy

বিরল ক্ষেত্রে অন্য রোগের সন্দেহ হলে ত্বকের বায়োপসি (Skin Biopsy) করা হতে পারে।


মেছতার চিকিৎসা

চিকিৎসার লক্ষ্য হলো দাগ হালকা করা এবং নতুন দাগ হওয়া প্রতিরোধ করা।

১. Sunscreen (সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ)

প্রতিদিন—

  • Broad-Spectrum SPF 30 বা তার বেশি

  • UVA ও UVB সুরক্ষাযুক্ত সানস্ক্রিন ব্যবহার করুন।

  • বাইরে থাকলে প্রতি ২–৩ ঘণ্টা পর পুনরায় লাগান।

২. ত্বকে ব্যবহারের ওষুধ

চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী—

  • Hydroquinone

  • Azelaic Acid

  • Tretinoin

  • Kojic Acid

  • Cysteamine Cream

  • Tranexamic Acid (Topical)

অনেক ক্ষেত্রে Triple Combination Cream (Hydroquinone + Tretinoin + Mild Corticosteroid) সীমিত সময়ের জন্য ব্যবহার করা হয়।

৩. মুখে খাওয়ার ওষুধ

নির্বাচিত রোগীর ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞের পরামর্শে Oral Tranexamic Acid ব্যবহার করা হতে পারে। এটি সবার জন্য উপযুক্ত নয় এবং চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণে গ্রহণ করা উচিত।

৪. প্রসিডিউর

ওষুধে ভালো ফল না পেলে—

  • Chemical Peel

  • Microneedling (নির্বাচিত ক্ষেত্রে)

  • Low-Fluence Laser Therapy (নির্বাচিত রোগীর ক্ষেত্রে)

লেজার সব রোগীর জন্য উপযুক্ত নয় এবং ভুলভাবে করলে দাগ আরও গাঢ় হতে পারে।


ঘরে কীভাবে যত্ন নেবেন?

  • প্রতিদিন সানস্ক্রিন ব্যবহার করুন।

  • দুপুর ১০টা থেকে বিকেল ৪টার মধ্যে অতিরিক্ত রোদ এড়িয়ে চলুন।

  • টুপি, ছাতা ও সানগ্লাস ব্যবহার করুন।

  • মৃদু (Gentle) স্কিন কেয়ার পণ্য ব্যবহার করুন।

  • স্টেরয়েডযুক্ত ফেয়ারনেস ক্রিম নিজে থেকে ব্যবহার করবেন না।


কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?

চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন যদি—

  • মুখে নতুন বাদামি দাগ দেখা দেয়

  • দাগ দ্রুত বাড়তে থাকে

  • গর্ভাবস্থার পরও দাগ কমে না

  • বাজারের ক্রিম ব্যবহার করেও উন্নতি না হয়

  • দাগের সঙ্গে ব্যথা, রক্তপাত বা ঘা হয়


সম্ভাব্য জটিলতা

মেছতা সাধারণত শারীরিক জটিলতা সৃষ্টি করে না। তবে—

  • আত্মবিশ্বাস কমে যেতে পারে

  • মানসিক চাপ বা উদ্বেগ তৈরি হতে পারে

  • চিকিৎসা বন্ধ করলে পুনরায় দাগ ফিরে আসতে পারে

  • স্টেরয়েডযুক্ত ক্রিমের অপব্যবহারে ত্বক পাতলা, ব্রণ বা স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে


প্রতিরোধের উপায়

  • প্রতিদিন Broad-Spectrum Sunscreen ব্যবহার করুন।

  • অতিরিক্ত রোদ এড়িয়ে চলুন।

  • সূর্যরোধী টুপি ও ছাতা ব্যবহার করুন।

  • চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া স্টেরয়েড ক্রিম ব্যবহার করবেন না।

  • হরমোনজাতীয় ওষুধ ব্যবহারের আগে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করুন।


প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

মেছতা কি সম্পূর্ণ ভালো হয়?

অনেক ক্ষেত্রে দাগ উল্লেখযোগ্যভাবে হালকা করা যায়, তবে পুনরায় হওয়ার ঝুঁকি থাকে। নিয়মিত সানস্ক্রিন ব্যবহার চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

মেছতা কি সংক্রামক?

না। এটি একজন থেকে আরেকজনের মধ্যে ছড়ায় না।

গর্ভাবস্থার মেছতা কি পরে চলে যায়?

অনেকের ক্ষেত্রে প্রসবের পর কিছুটা হালকা হয়ে যায়, তবে অনেকের দাগ থেকে যেতে পারে এবং চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।

লেজার কি মেছতার স্থায়ী সমাধান?

না। লেজার কিছু রোগীর ক্ষেত্রে উপকারী হলেও এটি স্থায়ী সমাধান নয় এবং ভুলভাবে ব্যবহার করলে সমস্যা বাড়তে পারে।

বাজারের ফেয়ারনেস ক্রিম ব্যবহার করা কি নিরাপদ?

সবসময় নয়। অনেক ক্রিমে ক্ষতিকর স্টেরয়েড বা পারদ (Mercury) থাকতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এসব ব্যবহার করা উচিত নয়।


মূল বিষয়গুলো (Key Takeaways)

  • মেছতা হলো মুখে বাদামি বা ধূসর-বাদামি দাগ হওয়ার একটি সাধারণ ত্বকের সমস্যা।

  • সূর্যের আলো ও হরমোনের পরিবর্তন প্রধান কারণ।

  • প্রতিদিন SPF 30 বা তার বেশি সানস্ক্রিন ব্যবহার চিকিৎসার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

  • Hydroquinone, Azelaic Acid, Tretinoin ও অন্যান্য ওষুধ বিশেষজ্ঞের পরামর্শে ব্যবহার করা হয়।

  • চিকিৎসা বন্ধ করলে বা সূর্য থেকে সুরক্ষা না নিলে মেছতা আবার ফিরে আসতে পারে।


তথ্যসূত্র

  • American Academy of Dermatology (AAD)

  • British Association of Dermatologists (BAD)

  • International League of Dermatological Societies (ILDS)

  • National Institute for Health and Care Excellence (NICE)

  • World Health Organization (WHO)


Medical Review

গুরুত্বপূর্ণ: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র স্বাস্থ্যশিক্ষার উদ্দেশ্যে প্রস্তুত করা হয়েছে। এটি ব্যক্তিগত চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়। আপনার যদি মুখে নতুন বা দ্রুত পরিবর্তনশীল কালচে দাগ, রক্তপাত, ঘা বা দীর্ঘদিনের মেছতা থাকে, তাহলে একজন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ (Dermatologist)-এর পরামর্শ নিন। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া স্টেরয়েডযুক্ত বা অজানা উপাদানের ফেয়ারনেস ক্রিম ব্যবহার করবেন না।

এই নিবন্ধটি American Academy of Dermatology (AAD), British Association of Dermatologists (BAD), International League of Dermatological Societies (ILDS), NICE এবং WHO-এর আন্তর্জাতিক ক্লিনিক্যাল নির্দেশিকার ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে এবং নির্ভুল, প্রমাণভিত্তিক ও হালনাগাদ চিকিৎসা তথ্য নিশ্চিত করতে নিয়মিত পর্যালোচনা করা হয়।

Content prepared by: Doctors24 Editorial Team

Medical information is verified using registered doctor data and trusted healthcare sources

Information sources: Public records, hospital data, and provided credentials

Published At: July 30, 2026

Last updated: July 30, 2026 Read Editorial Policy →

Related Dermatologist Articles

View all →