হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ: জরুরি করণীয়, কী পরীক্ষা করবেন ও কোন ডাক্তার দেখাবেন

Doctors24 Editorial TeamAugust 11, 2026
হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ: জরুরি করণীয়, কী পরীক্ষা করবেন ও কোন ডাক্তার দেখাবেন
Key Overview

"হার্ট অ্যাটাক কী? হার্ট অ্যাটাক (Heart Attack), চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন (Myocardial Infarction) , একটি জরুরি চিকিৎসাজনিত অবস্থা। এটি ত..."

হার্ট অ্যাটাক কী?

হার্ট অ্যাটাক (Heart Attack), চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন (Myocardial Infarction), একটি জরুরি চিকিৎসাজনিত অবস্থা। এটি তখন ঘটে যখন হৃদপিণ্ডে রক্ত সরবরাহকারী করোনারি ধমনীর (Coronary Artery) একটি বা একাধিক ধমনী হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে হৃদপেশিতে পর্যাপ্ত অক্সিজেন পৌঁছায় না এবং দ্রুত চিকিৎসা না হলে হৃদপেশির স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে।

হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ দেখা দিলে এক মুহূর্তও দেরি না করে নিকটস্থ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যেতে হবে।


হার্ট অ্যাটাক কেন হয়?

হার্ট অ্যাটাকের সবচেয়ে সাধারণ কারণ হলো করোনারি ধমনীতে চর্বি (Plaque) জমে ধমনী সরু হয়ে যাওয়া (Atherosclerosis)। কোনো প্লাক ফেটে সেখানে রক্ত জমাট (Blood Clot) তৈরি হলে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে হার্ট অ্যাটাক হতে পারে।

করোনারি আর্টারি ডিজিজ (Coronary Artery Disease)

হার্ট অ্যাটাকের প্রধান কারণ। ধমনীর ভেতরে চর্বি জমে রক্তপ্রবাহ কমে যায়।

উচ্চ রক্তচাপ (High Blood Pressure)

দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ ধমনীর ক্ষতি করে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ায়।

উচ্চ কোলেস্টেরল

খারাপ কোলেস্টেরল (LDL) বেড়ে গেলে ধমনীতে প্লাক জমে।

ডায়াবেটিস

অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস রক্তনালীর ক্ষতি করে এবং হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায়।

ধূমপান

ধূমপান ধমনীর ক্ষতি করে এবং রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি বৃদ্ধি করে।

স্থূলতা ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা

অতিরিক্ত ওজন, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং ব্যায়ামের অভাব হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়।

অতিরিক্ত মানসিক চাপ

দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ, পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব এবং অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপনও ঝুঁকি বাড়াতে পারে।


হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকির কারণ

নিচের বিষয়গুলো থাকলে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বেড়ে যায়—

  • ৪৫ বছরের বেশি বয়সী পুরুষ

  • ৫৫ বছরের বেশি বয়সী নারী

  • পরিবারে অল্প বয়সে হৃদরোগের ইতিহাস

  • উচ্চ রক্তচাপ

  • ডায়াবেটিস

  • উচ্চ কোলেস্টেরল

  • ধূমপান বা তামাক ব্যবহার

  • স্থূলতা

  • নিয়মিত ব্যায়াম না করা

  • দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগ

  • অতিরিক্ত মদ্যপান


হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ

হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ ব্যক্তি ভেদে ভিন্ন হতে পারে। সাধারণ লক্ষণগুলো হলো—

  • বুকের মাঝখানে চাপ, ভারী অনুভূতি বা তীব্র ব্যথা

  • ব্যথা বাম হাত, দুই হাত, কাঁধ, ঘাড়, চোয়াল বা পিঠে ছড়িয়ে পড়া

  • শ্বাসকষ্ট

  • ঠান্ডা ঘাম

  • বমি বমি ভাব বা বমি

  • মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া

  • অতিরিক্ত দুর্বলতা

  • অস্থিরতা বা মৃত্যুভয়

নারী, বয়স্ক ব্যক্তি এবং ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র শ্বাসকষ্ট, দুর্বলতা, বমি বমি ভাব বা অস্বাভাবিক ক্লান্তিও হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ হতে পারে।


কখন জরুরি হাসপাতালে যাবেন?

নিচের যেকোনো লক্ষণ থাকলে এটি চিকিৎসা জরুরি অবস্থা হিসেবে বিবেচনা করুন—

  • বুকে ব্যথা ১০–১৫ মিনিটের বেশি স্থায়ী হওয়া

  • ব্যথা হাত, ঘাড়, চোয়াল বা পিঠে ছড়িয়ে পড়া

  • শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া

  • ঠান্ডা ঘাম ও মাথা ঘোরা

  • অজ্ঞান হয়ে যাওয়া

  • বুকে ব্যথার সঙ্গে বমি বা অতিরিক্ত দুর্বলতা

নিজে গাড়ি চালিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার চেষ্টা করবেন না। সম্ভব হলে জরুরি অ্যাম্বুলেন্স সেবা ব্যবহার করুন।


হার্ট অ্যাটাক হলে জরুরি করণীয়

  • দ্রুত জরুরি চিকিৎসা সহায়তা নিন।

  • রোগীকে বসিয়ে বা আধাশোয়া অবস্থায় রাখুন।

  • আঁটসাঁট পোশাক ঢিলা করে দিন।

  • রোগীকে শান্ত রাখার চেষ্টা করুন।

  • চিকিৎসকের পরামর্শ থাকলে বা জরুরি সেবাকর্মীর নির্দেশে অ্যাসপিরিন চিবিয়ে খাওয়ানো যেতে পারে।

  • রোগী অচেতন হয়ে গেলে এবং শ্বাস-প্রশ্বাস বা নাড়ি না থাকলে প্রশিক্ষিত ব্যক্তি CPR শুরু করুন।

নিজে থেকে ব্যথানাশক বা ঘরোয়া চিকিৎসার ওপর নির্ভর করবেন না।


হার্ট অ্যাটাকের জন্য কী কী পরীক্ষা করা হয়?

চিকিৎসক রোগীর অবস্থা অনুযায়ী নিচের পরীক্ষাগুলো করতে পারেন।

ইসিজি (ECG)

হার্ট অ্যাটাক শনাক্ত করার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও দ্রুত পরীক্ষা।

ট্রোপোনিন (Troponin Test)

হার্টের পেশির ক্ষতি হয়েছে কি না তা নির্ণয়ের জন্য সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য রক্ত পরীক্ষা।

ইকোকার্ডিওগ্রাম (Echocardiogram)

হৃদপিণ্ডের গঠন ও পাম্প করার ক্ষমতা মূল্যায়ন করা হয়।

করোনারি অ্যাঞ্জিওগ্রাম (Coronary Angiography)

হৃদপিণ্ডের রক্তনালী কোথায় ব্লক হয়েছে তা নির্ণয় করতে করা হয়।

বুকের এক্স-রে (Chest X-ray)

অন্যান্য হৃদ্‌ বা ফুসফুসের সমস্যা মূল্যায়নে করা হতে পারে।

অন্যান্য রক্ত পরীক্ষা

  • Complete Blood Count (CBC)

  • Blood Sugar

  • Lipid Profile

  • Kidney Function Test


হার্ট অ্যাটাকের চিকিৎসা

চিকিৎসা যত দ্রুত শুরু হবে, হৃদপেশি বাঁচানোর সম্ভাবনা তত বেশি।

ওষুধ

  • Antiplatelet ওষুধ

  • Anticoagulant

  • Statin

  • Nitrate

  • Beta-blocker (প্রয়োজন অনুযায়ী)

প্রাইমারি অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি (Primary PCI)

ব্লক হওয়া ধমনী দ্রুত খুলে দেওয়ার সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা।

থ্রম্বোলাইটিক থেরাপি

যেখানে দ্রুত PCI সম্ভব নয়, সেখানে নির্দিষ্ট রোগীর ক্ষেত্রে রক্ত জমাট গলানোর ওষুধ দেওয়া হতে পারে।

করোনারি আর্টারি বাইপাস সার্জারি (CABG)

একাধিক ধমনীতে জটিল ব্লক থাকলে প্রয়োজন হতে পারে।

কার্ডিয়াক রিহ্যাবিলিটেশন

চিকিৎসার পর নিয়মিত ব্যায়াম, খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণ, ওষুধ সেবন এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ।


হার্ট অ্যাটাক হলে কোন ডাক্তার দেখাবেন?

হার্ট অ্যাটাক সন্দেহ হলে সরাসরি হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যান।

পরবর্তীতে চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন হতে পারে—

  • কার্ডিওলজিস্ট (হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ)

  • ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট

  • কার্ডিয়াক সার্জন (প্রয়োজন হলে)

  • ইন্টারনাল মেডিসিন বিশেষজ্ঞ (ফলো-আপে)


হার্ট অ্যাটাক প্রতিরোধের উপায়

  • ধূমপান সম্পূর্ণ বন্ধ করুন।

  • রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখুন।

  • সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার ব্যায়াম করুন।

  • কম লবণ, কম চর্বিযুক্ত স্বাস্থ্যকর খাবার খান।

  • ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন।

  • পর্যাপ্ত ঘুমান।

  • মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করুন।

  • নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করুন।


প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

হার্ট অ্যাটাকের সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ কী?

বুকের মাঝখানে চাপ বা ব্যথা, যা হাত, ঘাড়, চোয়াল বা পিঠে ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং এর সঙ্গে শ্বাসকষ্ট বা ঠান্ডা ঘাম থাকতে পারে।

হার্ট অ্যাটাক ও গ্যাসের ব্যথার মধ্যে পার্থক্য কী?

গ্যাসের ব্যথা সাধারণত খাবার বা বদহজমের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং অনেক সময় ঢেকুর বা ওষুধে কমে যায়। কিন্তু হার্ট অ্যাটাকের ব্যথা সাধারণত চাপধরনের হয়, শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং শ্বাসকষ্ট বা ঘাম হতে পারে। সন্দেহ হলে নিজে সিদ্ধান্ত না নিয়ে দ্রুত হাসপাতালে যান।

হার্ট অ্যাটাক হলে কত দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে?

যত দ্রুত সম্ভব। লক্ষণ শুরু হওয়ার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টা চিকিৎসার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

ইসিজি স্বাভাবিক থাকলেও কি হার্ট অ্যাটাক হতে পারে?

হ্যাঁ। কিছু ক্ষেত্রে প্রাথমিক ইসিজি স্বাভাবিক থাকতে পারে। তাই চিকিৎসক প্রয়োজনে পুনরায় ইসিজি ও ট্রোপোনিন পরীক্ষা করতে পারেন।

হার্ট অ্যাটাকের পর কি স্বাভাবিক জীবনযাপন সম্ভব?

অনেক রোগী সঠিক চিকিৎসা, নিয়মিত ওষুধ, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চললে স্বাভাবিক ও কর্মক্ষম জীবনযাপন করতে পারেন।


মেডিক্যাল ডিসক্লেইমার: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র সাধারণ স্বাস্থ্য তথ্যের উদ্দেশ্যে তৈরি। এটি চিকিৎসকের পরামর্শ, রোগ নির্ণয় বা চিকিৎসার বিকল্প নয়। হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ দেখা দিলে নিজে চিকিৎসা করার চেষ্টা না করে অবিলম্বে নিকটস্থ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যান।

Content prepared by: Doctors24 Editorial Team

Medical information is verified using registered doctor data and trusted healthcare sources

Information sources: Public records, hospital data, and provided credentials

Published At: August 11, 2026

Last updated: August 11, 2026 Read Editorial Policy →

Related Cardiologist Articles

View all →

Related Cardiologist Videos

View all →