গর্ভকালীন ডায়াবেটিস (Gestational Diabetes): কারণ, লক্ষণ, চিকিৎসা ও করণীয়

Doctors24 Editorial TeamAugust 7, 2026
গর্ভকালীন ডায়াবেটিস (Gestational Diabetes): কারণ, লক্ষণ, চিকিৎসা ও করণীয়
Key Overview

"গর্ভকালীন ডায়াবেটিস (Gestational Diabetes Mellitus বা GDM ) হলো এমন একটি অবস্থা, যেখানে গর্ভাবস্থায় প্রথমবারের মতো রক্তে শর্করার (Blood Glucose) মাত্রা স্বাভা..."

গর্ভকালীন ডায়াবেটিস (Gestational Diabetes Mellitus বা GDM) হলো এমন একটি অবস্থা, যেখানে গর্ভাবস্থায় প্রথমবারের মতো রক্তে শর্করার (Blood Glucose) মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যায়। এটি সাধারণত গর্ভাবস্থার দ্বিতীয় বা তৃতীয় ত্রৈমাসিকে (Second বা Third Trimester) ধরা পড়ে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সন্তান জন্মের পর স্বাভাবিক হয়ে যায়। তবে ভবিষ্যতে মা ও সন্তানের উভয়েরই টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

সময়মতো শনাক্ত করে খাদ্যাভ্যাস, ব্যায়াম, রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজনে ওষুধ বা ইনসুলিনের মাধ্যমে অধিকাংশ গর্ভবতী নারী সুস্থভাবে গর্ভাবস্থা সম্পন্ন করতে পারেন এবং সুস্থ শিশুর জন্ম দিতে পারেন।


গর্ভকালীন ডায়াবেটিস কী?

গর্ভকালীন ডায়াবেটিস (Gestational Diabetes Mellitus - GDM) হলো এমন এক ধরনের ডায়াবেটিস, যা গর্ভাবস্থায় প্রথম শনাক্ত হয় এবং আগে থেকে ডায়াবেটিস ছিল না।

গর্ভাবস্থায় প্লাসেন্টা থেকে উৎপন্ন কিছু হরমোন ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয় (Insulin Resistance)। যখন শরীর অতিরিক্ত ইনসুলিন তৈরি করে এই পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে না, তখন রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যায়।


সংক্ষেপে (Quick Facts)

বিষয়

তথ্য

চিকিৎসা নাম

Gestational Diabetes Mellitus (GDM)

কখন হয়

সাধারণত গর্ভাবস্থার ২৪–২৮ সপ্তাহে ধরা পড়ে

প্রধান চিকিৎসা

খাদ্য নিয়ন্ত্রণ, ব্যায়াম, রক্তে শর্করা পর্যবেক্ষণ

ইনসুলিন লাগতে পারে?

কিছু রোগীর ক্ষেত্রে হ্যাঁ

কোন বিশেষজ্ঞ দেখাবেন

স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ (Gynecologist), ডায়াবেটোলজিস্ট বা এন্ডোক্রিনোলজিস্ট

🚨 জরুরি সতর্কতা

নিচের যেকোনো লক্ষণ থাকলে দ্রুত হাসপাতালে যোগাযোগ করুন—

  • শিশুর নড়াচড়া উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়া

  • ঝাপসা দেখা বা তীব্র মাথাব্যথা

  • উচ্চ রক্তচাপের সঙ্গে হাত-পা বা মুখ ফুলে যাওয়া

  • যোনিপথে রক্তপাত বা পানি ভেঙে যাওয়া

  • তীব্র পেটব্যথা বা নিয়মিত প্রসববেদনা

  • রক্তে শর্করা খুব বেশি বা খুব কম হয়ে যাওয়ার লক্ষণ


গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের লক্ষণ

অনেক গর্ভবতী নারীর কোনো লক্ষণ থাকে না। তাই নিয়মিত স্ক্রিনিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

লক্ষণ থাকলে হতে পারে—

  • অতিরিক্ত পিপাসা

  • ঘন ঘন প্রস্রাব

  • অতিরিক্ত ক্ষুধা

  • ক্লান্তি

  • ঝাপসা দেখা

  • বারবার মূত্রনালির সংক্রমণ

দ্রষ্টব্য: গর্ভাবস্থায় ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া স্বাভাবিকও হতে পারে। তাই শুধুমাত্র এই লক্ষণ দিয়ে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস নির্ণয় করা যায় না।


গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের কারণ

গর্ভাবস্থায় প্লাসেন্টা থেকে নিঃসৃত হরমোন শরীরে ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়। অধিকাংশ নারীর শরীর অতিরিক্ত ইনসুলিন তৈরি করে এই পরিবর্তন সামাল দিতে পারে। কিন্তু যাদের শরীর তা করতে পারে না, তাদের গর্ভকালীন ডায়াবেটিস হতে পারে।


ঝুঁকির কারণ

নিচের অবস্থায় গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বেশি—

  • পূর্বে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস হওয়া

  • BMI বেশি বা স্থূলতা

  • পরিবারে টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ইতিহাস

  • পূর্বে ৪ কেজি বা তার বেশি ওজনের শিশু জন্ম দেওয়া

  • Polycystic Ovary Syndrome (PCOS)

  • বয়স ৩৫ বছর বা তার বেশি

  • পূর্বে অকারণে মৃত সন্তান প্রসব বা পুনঃপুন গর্ভপাতের ইতিহাস (কিছু ক্ষেত্রে)

  • নির্দিষ্ট কিছু জাতিগত জনগোষ্ঠী, যাদের মধ্যে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বেশি


কীভাবে রোগ নির্ণয় করা হয়?

গর্ভকালীন ডায়াবেটিস নির্ণয়ের জন্য রক্তে শর্করার বিশেষ পরীক্ষা করা হয়।

কখন পরীক্ষা করা হয়?

  • সাধারণত ২৪–২৮ সপ্তাহের মধ্যে স্ক্রিনিং করা হয়।

  • উচ্চ ঝুঁকির রোগীদের ক্ষেত্রে গর্ভাবস্থার শুরুতেই পরীক্ষা করা হতে পারে।


প্রয়োজনীয় পরীক্ষা

পরীক্ষা

কেন করা হয়

75-gram Oral Glucose Tolerance Test (OGTT)

গর্ভকালীন ডায়াবেটিস নির্ণয়ের প্রধান পরীক্ষা

Fasting Blood Glucose

রক্তে শর্করার প্রাথমিক মূল্যায়ন

HbA1c

নির্বাচিত ক্ষেত্রে পূর্বের ডায়াবেটিস মূল্যায়নে

Urine Test

প্রস্রাবে সংক্রমণ বা অন্যান্য সমস্যা মূল্যায়নে

Ultrasound

শিশুর বৃদ্ধি, ওজন ও অ্যামনিওটিক ফ্লুইড মূল্যায়নে

গুরুত্বপূর্ণ: OGTT-এর নির্ণায়ক মান (Diagnostic Criteria) বিভিন্ন আন্তর্জাতিক নির্দেশিকায় কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। তাই রিপোর্টের ব্যাখ্যা চিকিৎসক করবেন।


গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের চিকিৎসা

চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হলো মা ও শিশুর জন্য নিরাপদ মাত্রায় রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখা।

১. খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন

  • পরিমিত ক্যালোরিযুক্ত সুষম খাদ্য গ্রহণ করুন।

  • একবারে বেশি না খেয়ে অল্প অল্প করে কয়েকবার খান।

  • বেশি আঁশযুক্ত খাবার (শাকসবজি, ডাল, পূর্ণ শস্য) গ্রহণ করুন।

  • অতিরিক্ত মিষ্টি, কোমল পানীয় ও পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট কমান।

  • পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী খাদ্য পরিকল্পনা করুন।

২. নিয়মিত ব্যায়াম

চিকিৎসকের অনুমতি থাকলে—

  • প্রতিদিন প্রায় ৩০ মিনিট মাঝারি মাত্রার হাঁটা বা গর্ভাবস্থার উপযোগী ব্যায়াম করুন।

  • যেসব গর্ভাবস্থায় ব্যায়াম নিষেধ, সেসব ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসরণ করুন।

৩. রক্তে শর্করা পর্যবেক্ষণ

চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী বাড়িতে গ্লুকোমিটার দিয়ে রক্তে শর্করা মাপতে হতে পারে।

৪. ইনসুলিন

যদি খাদ্যাভ্যাস ও ব্যায়ামে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে না আসে, তাহলে ইনসুলিন প্রয়োজন হতে পারে।

৫. মুখে খাওয়ার ওষুধ

কিছু ক্ষেত্রে Metformin বা অন্যান্য ওষুধ বিবেচনা করা হতে পারে। তবে কোন ওষুধ উপযুক্ত হবে তা চিকিৎসক নির্ধারণ করবেন।


মা ও শিশুর সম্ভাব্য জটিলতা

মায়ের ক্ষেত্রে

  • উচ্চ রক্তচাপ

  • প্রি-এক্ল্যাম্পসিয়া

  • সিজারিয়ান অপারেশনের সম্ভাবনা বৃদ্ধি

  • ভবিষ্যতে টাইপ ২ ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি

শিশুর ক্ষেত্রে

  • জন্মের সময় ওজন বেশি হওয়া (Macrosomia)

  • জন্মের সময় কাঁধ আটকে যাওয়া (Shoulder Dystocia)

  • জন্মের পর রক্তে শর্করা কমে যাওয়া (Neonatal Hypoglycemia)

  • শ্বাসকষ্ট

  • ভবিষ্যতে স্থূলতা ও টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বৃদ্ধি


প্রসবের পর করণীয়

  • অধিকাংশ ক্ষেত্রে সন্তান জন্মের পর রক্তে শর্করা স্বাভাবিক হয়ে যায়।

  • সাধারণত প্রসবের ৬–১২ সপ্তাহ পরে পুনরায় 75-gram OGTT করার পরামর্শ দেওয়া হয়।

  • এরপর নিয়মিত ডায়াবেটিস স্ক্রিনিং করা উচিত, কারণ ভবিষ্যতে টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বেশি থাকে।

  • শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো মা ও শিশুর উভয়ের জন্য উপকারী।


জীবনযাপনের পরিবর্তন

  • স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখুন।

  • চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাদ্য গ্রহণ করুন।

  • নিয়মিত হাঁটুন।

  • পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন।

  • নির্ধারিত সময়ে প্রসূতি ও ডায়াবেটিস ফলো-আপ করুন।

  • ধূমপান ও অ্যালকোহল সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলুন।


কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?

নিচের যেকোনো পরিস্থিতিতে দ্রুত স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন—

  • রক্তে শর্করা বারবার বেশি থাকলে

  • শিশুর নড়াচড়া কমে গেলে

  • উচ্চ রক্তচাপ বা তীব্র মাথাব্যথা হলে

  • ঝাপসা দেখা বা হাত-মুখ ফুলে গেলে

  • প্রসবের আগেই পানি ভেঙে গেলে

  • যোনিপথে রক্তপাত হলে


প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

গর্ভকালীন ডায়াবেটিস কি সন্তান জন্মের পর ভালো হয়ে যায়?

বেশিরভাগ নারীর ক্ষেত্রে হ্যাঁ। তবে ভবিষ্যতে টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বেড়ে যায়, তাই নিয়মিত পরীক্ষা জরুরি।

গর্ভকালীন ডায়াবেটিস হলে কি সবসময় ইনসুলিন লাগে?

না। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে শুধু খাদ্য নিয়ন্ত্রণ ও ব্যায়ামের মাধ্যমেই রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

গর্ভকালীন ডায়াবেটিস থাকলে কি স্বাভাবিক প্রসব সম্ভব?

হ্যাঁ। অনেক নারী স্বাভাবিক প্রসব করতে পারেন। তবে প্রসবের ধরন মা ও শিশুর অবস্থা, শিশুর ওজন এবং অন্যান্য প্রসূতি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে।

গর্ভকালীন ডায়াবেটিস কি শিশুর জন্মগত ত্রুটি সৃষ্টি করে?

গর্ভাবস্থায় প্রথমবার হওয়া GDM সাধারণত জন্মগত ত্রুটির ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায় না। তবে আগে থেকেই অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস থাকলে সেই ঝুঁকি বেশি হতে পারে।

পরবর্তী গর্ভাবস্থায় কি আবার গর্ভকালীন ডায়াবেটিস হতে পারে?

হ্যাঁ। একবার GDM হলে পরবর্তী গর্ভাবস্থায় পুনরায় হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।


মূল বিষয়গুলো (Key Takeaways)

  • গর্ভকালীন ডায়াবেটিস সাধারণত ২৪–২৮ সপ্তাহে শনাক্ত হয়।

  • অনেক রোগীর কোনো লক্ষণ থাকে না, তাই নিয়মিত স্ক্রিনিং গুরুত্বপূর্ণ।

  • স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম এবং রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণই চিকিৎসার মূল ভিত্তি।

  • প্রয়োজনে ইনসুলিন বা অন্য ওষুধ ব্যবহার করা হতে পারে।

  • প্রসবের পরও নিয়মিত ডায়াবেটিস পরীক্ষা করা জরুরি, কারণ ভবিষ্যতে টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।


তথ্যসূত্র

  • World Health Organization (WHO)

  • American Diabetes Association (ADA) – Standards of Care

  • International Federation of Gynecology and Obstetrics (FIGO)

  • American College of Obstetricians and Gynecologists (ACOG)

  • National Institute for Health and Care Excellence (NICE)


Medical Review

গুরুত্বপূর্ণ: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র স্বাস্থ্যশিক্ষার উদ্দেশ্যে প্রস্তুত করা হয়েছে। এটি কোনো ব্যক্তিগত চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়। গর্ভাবস্থায় রক্তে শর্করা বেড়ে গেলে বা গর্ভকালীন ডায়াবেটিস ধরা পড়লে অবশ্যই একজন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ এবং প্রয়োজনে ডায়াবেটোলজিস্ট বা এন্ডোক্রিনোলজিস্টের নিয়মিত তত্ত্বাবধানে থাকুন।

এই নিবন্ধটি WHO, ADA, FIGO, ACOG এবং NICE-এর আন্তর্জাতিক চিকিৎসা নির্দেশিকার ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়মিত হালনাগাদ করা হয় যাতে পাঠক সর্বশেষ ও নির্ভরযোগ্য স্বাস্থ্যতথ্য পান।

Content prepared by: Doctors24 Editorial Team

Medical information is verified using registered doctor data and trusted healthcare sources

Information sources: Public records, hospital data, and provided credentials

Published At: August 7, 2026

Last updated: August 7, 2026 Read Editorial Policy →

Related Diabetologist Articles

View all →

Related Diabetologist Videos

View all →