সন্তান না হওয়ার কারণ: নারী ও পুরুষ উভয়ের সাধারণ কারণ

Doctors24 Editorial TeamJuly 29, 2026
সন্তান না হওয়ার কারণ: নারী ও পুরুষ উভয়ের সাধারণ কারণ
Key Overview

"সন্তান না হওয়া বা বন্ধ্যাত্ব (Infertility) এমন একটি অবস্থা, যেখানে নিয়মিত অসুরক্ষিত যৌনমিলনের পরও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গর্ভধারণ হয় না। সাধারণভাবে ৩৫ বছরের..."

সন্তান না হওয়া বা বন্ধ্যাত্ব (Infertility) এমন একটি অবস্থা, যেখানে নিয়মিত অসুরক্ষিত যৌনমিলনের পরও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গর্ভধারণ হয় না। সাধারণভাবে ৩৫ বছরের কম বয়সী দম্পতির ক্ষেত্রে ১২ মাস এবং ৩৫ বছর বা তার বেশি বয়সে ৬ মাস চেষ্টা করার পরও গর্ভধারণ না হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

অনেকেই মনে করেন সন্তান না হওয়ার জন্য শুধুমাত্র নারীর সমস্যা দায়ী। কিন্তু বাস্তবে নারী ও পুরুষ—উভয়ের কারণেই বন্ধ্যাত্ব হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে উভয়েরই কিছু সমস্যা থাকে, আবার কিছু ক্ষেত্রে সব পরীক্ষা স্বাভাবিক থাকলেও কারণ নির্দিষ্টভাবে জানা যায় না।


বন্ধ্যাত্ব কী?

বন্ধ্যাত্ব (Infertility) হলো এমন একটি চিকিৎসাবিজ্ঞানসম্মত অবস্থা, যেখানে নিয়মিত অসুরক্ষিত যৌনমিলনের পরও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গর্ভধারণ হয় না।

বন্ধ্যাত্বের ধরন

  • প্রাথমিক বন্ধ্যাত্ব (Primary Infertility): আগে কখনও গর্ভধারণ হয়নি।

  • দ্বিতীয়িক বন্ধ্যাত্ব (Secondary Infertility): আগে অন্তত একবার গর্ভধারণ হয়েছে, কিন্তু পরে আর গর্ভধারণ হচ্ছে না।


সংক্ষেপে (Quick Facts)

বিষয়

তথ্য

চিকিৎসা নাম

Infertility

নারী ও পুরুষ—উভয়ের কারণ থাকতে পারে

হ্যাঁ

চিকিৎসাযোগ্য?

অনেক ক্ষেত্রেই হ্যাঁ

কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন

১ বছর (বা ৩৫ বছরের বেশি হলে ৬ মাস) চেষ্টা করেও গর্ভধারণ না হলে

কোন বিশেষজ্ঞ দেখাবেন

বন্ধ্যাত্ব বিশেষজ্ঞ, স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ, ইউরোলজিস্ট/অ্যান্ড্রোলজিস্ট


সন্তান না হওয়ার কারণ: নারীদের ক্ষেত্রে

১. ডিম্বস্ফোটনের সমস্যা (Ovulation Disorders)

এটি নারীদের বন্ধ্যাত্বের অন্যতম প্রধান কারণ।

এর মধ্যে রয়েছে—

  • পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (PCOS)

  • হরমোনের ভারসাম্যহীনতা

  • থাইরয়েড রোগ

  • উচ্চ প্রোল্যাক্টিন (Hyperprolactinemia)

  • অকাল ডিম্বাশয় অকার্যকারিতা (Premature Ovarian Insufficiency)


২. ফ্যালোপিয়ান টিউব ব্লক হয়ে যাওয়া

যদি ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর মিলন সম্ভব না হয়, তাহলে গর্ভধারণ হয় না।

কারণ হতে পারে—

  • পেলভিক ইনফেকশন

  • যৌনবাহিত সংক্রমণ (STI)

  • এন্ডোমেট্রিওসিস

  • পূর্বের অস্ত্রোপচার


৩. এন্ডোমেট্রিওসিস

জরায়ুর ভেতরের আবরণজাতীয় টিস্যু শরীরের অন্য স্থানে বেড়ে গেলে ডিম্বাশয়, টিউব ও পেলভিক অঙ্গের স্বাভাবিক কার্যকারিতা ব্যাহত হতে পারে।


৪. জরায়ুর সমস্যা

  • জরায়ুর ফাইব্রয়েড

  • জন্মগত জরায়ুর ত্রুটি

  • জরায়ুর পলিপ

  • Asherman Syndrome (জরায়ুর ভেতরে দাগ)


৫. বয়স

৩৫ বছরের পর নারীর ডিম্বাণুর সংখ্যা ও গুণগত মান ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। ৪০ বছরের পর গর্ভধারণের সম্ভাবনা আরও কমে যায়।


৬. অন্যান্য কারণ

  • স্থূলতা

  • অতিরিক্ত ওজন কম হওয়া

  • ডায়াবেটিস

  • ধূমপান

  • অতিরিক্ত অ্যালকোহল

  • কিছু ওষুধ

  • ক্যান্সারের চিকিৎসা (কেমোথেরাপি বা রেডিওথেরাপি)


সন্তান না হওয়ার কারণ: পুরুষদের ক্ষেত্রে

১. শুক্রাণুর সংখ্যা কম (Low Sperm Count)

শুক্রাণুর সংখ্যা স্বাভাবিকের তুলনায় কম হলে গর্ভধারণের সম্ভাবনা কমে যায়।


২. শুক্রাণুর চলাচল কম (Poor Motility)

শুক্রাণু ঠিকভাবে ডিম্বাণুর কাছে পৌঁছাতে না পারলে নিষেক সম্ভব হয় না।


৩. শুক্রাণুর গঠনগত সমস্যা (Abnormal Morphology)

শুক্রাণুর আকৃতি অস্বাভাবিক হলে নিষেকের ক্ষমতা কমে যেতে পারে।


৪. ভেরিকোসিল (Varicocele)

অণ্ডথলির শিরা ফুলে গেলে শুক্রাণুর উৎপাদন ও গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।


৫. হরমোনজনিত সমস্যা

  • টেস্টোস্টেরন কম থাকা

  • পিটুইটারি গ্রন্থির রোগ

  • থাইরয়েড সমস্যা


৬. সংক্রমণ

  • মাম্পসের পর অণ্ডকোষের প্রদাহ

  • যৌনবাহিত সংক্রমণ

  • প্রোস্টেটের সংক্রমণ


৭. জীবনযাপনের কারণ

  • ধূমপান

  • অতিরিক্ত অ্যালকোহল

  • মাদক

  • স্থূলতা

  • অতিরিক্ত তাপের সংস্পর্শ

  • দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ

  • পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব


উভয়ের সাধারণ ঝুঁকির কারণ

  • বয়স বৃদ্ধি

  • স্থূলতা

  • ডায়াবেটিস

  • ধূমপান

  • অতিরিক্ত অ্যালকোহল

  • পরিবেশগত বিষাক্ত রাসায়নিকের সংস্পর্শ

  • অপুষ্টি

  • দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ


কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?

নিচের যেকোনো পরিস্থিতিতে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত—

  • ১২ মাস চেষ্টা করেও গর্ভধারণ না হলে

  • ৩৫ বছর বা তার বেশি বয়সে ৬ মাস চেষ্টা করেও গর্ভধারণ না হলে

  • মাসিক অনিয়মিত বা একেবারে না হলে

  • একাধিকবার গর্ভপাত হয়ে থাকলে

  • পুরুষের যৌন বা শুক্রাণুজনিত সমস্যা থাকলে

  • ক্যান্সারের চিকিৎসার ইতিহাস থাকলে


কী কী পরীক্ষা করা হতে পারে?

নারীদের ক্ষেত্রে

  • ওভুলেশন মূল্যায়ন

  • AMH পরীক্ষা

  • FSH, LH, Prolactin

  • Thyroid Function Test

  • Pelvic Ultrasound

  • HSG (Fallopian Tube পরীক্ষা)

  • প্রয়োজনে Laparoscopy

পুরুষদের ক্ষেত্রে

  • Semen Analysis (সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ)

  • Hormone Test

  • Scrotal Ultrasound

  • Genetic Test (নির্বাচিত ক্ষেত্রে)


চিকিৎসা

চিকিৎসা নির্ভর করে কারণের ওপর।

সম্ভাব্য চিকিৎসা—

  • জীবনযাত্রার পরিবর্তন

  • ওভুলেশন বাড়ানোর ওষুধ

  • হরমোন চিকিৎসা

  • সংক্রমণের চিকিৎসা

  • ভেরিকোসিল অপারেশন

  • IUI (Intrauterine Insemination)

  • IVF (In Vitro Fertilization)

  • ICSI (Intracytoplasmic Sperm Injection)


বন্ধ্যাত্ব কি সবসময় স্থায়ী?

না। অনেক ক্ষেত্রেই সঠিক কারণ শনাক্ত করে চিকিৎসা দিলে স্বাভাবিকভাবে বা সহায়ক প্রজনন প্রযুক্তির মাধ্যমে সফলভাবে সন্তান ধারণ সম্ভব হয়।


প্রতিরোধের উপায়

  • স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখুন।

  • ধূমপান ও মাদক পরিহার করুন।

  • অতিরিক্ত অ্যালকোহল এড়িয়ে চলুন।

  • সুষম খাদ্য গ্রহণ করুন।

  • নিয়মিত ব্যায়াম করুন।

  • যৌনবাহিত সংক্রমণ থেকে সুরক্ষিত থাকুন।

  • দীর্ঘদিন সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা পিছিয়ে না দেওয়ার বিষয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন, বিশেষ করে বয়স ৩৫ বছরের কাছাকাছি বা বেশি হলে।


প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

সন্তান না হওয়ার জন্য কি সবসময় নারীর সমস্যা দায়ী?

না। প্রায় সমান হারে নারী ও পুরুষ—উভয়ের কারণেই বন্ধ্যাত্ব হতে পারে, আবার কিছু ক্ষেত্রে উভয়েরই সমস্যা থাকতে পারে।

পুরুষের প্রথম কোন পরীক্ষা করা হয়?

সাধারণত Semen Analysis হলো পুরুষের বন্ধ্যাত্ব মূল্যায়নের প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

PCOS থাকলে কি সন্তান হওয়া সম্ভব?

হ্যাঁ। অনেক PCOS রোগী সঠিক চিকিৎসা ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমে সফলভাবে গর্ভধারণ করেন।

IVF কি সবার জন্য প্রয়োজন?

না। IVF কেবল নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে প্রয়োজন হয়। অনেক দম্পতির ক্ষেত্রে সহজ চিকিৎসা বা ওষুধেই গর্ভধারণ সম্ভব।

মানসিক চাপ কি সন্তান ধারণে প্রভাব ফেলে?

দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ হরমোনের ভারসাম্য ও যৌনজীবনে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এটি সাধারণত একমাত্র কারণ নয়।


মূল বিষয়গুলো (Key Takeaways)

  • সন্তান না হওয়ার জন্য নারী ও পুরুষ—উভয়েরই কারণ থাকতে পারে।

  • নারীদের ক্ষেত্রে ডিম্বস্ফোটনের সমস্যা এবং পুরুষদের ক্ষেত্রে শুক্রাণুর সমস্যা সবচেয়ে সাধারণ কারণ।

  • ৩৫ বছরের কম বয়সে ১২ মাস এবং ৩৫ বছর বা তার বেশি হলে ৬ মাস চেষ্টা করেও গর্ভধারণ না হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

  • Semen Analysis এবং নারীর ওভুলেশন মূল্যায়ন প্রাথমিক পরীক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

  • অধিকাংশ ক্ষেত্রে আধুনিক চিকিৎসার মাধ্যমে সফলভাবে গর্ভধারণের সম্ভাবনা বাড়ানো যায়।


তথ্যসূত্র

  • World Health Organization (WHO)

  • American Society for Reproductive Medicine (ASRM)

  • European Society of Human Reproduction and Embryology (ESHRE)

  • American College of Obstetricians and Gynecologists (ACOG)

  • National Institute for Health and Care Excellence (NICE)


Medical Review

গুরুত্বপূর্ণ: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র স্বাস্থ্যশিক্ষার উদ্দেশ্যে প্রস্তুত করা হয়েছে। এটি কোনো ব্যক্তিগত চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়। সন্তান ধারণে সমস্যা হলে নারী ও পুরুষ—উভয়েরই একসঙ্গে মূল্যায়ন করা উচিত। প্রয়োজন অনুযায়ী একজন বন্ধ্যাত্ব বিশেষজ্ঞ, স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ বা ইউরোলজিস্ট/অ্যান্ড্রোলজিস্টের পরামর্শ নিন।

এই নিবন্ধটি WHO, ASRM, ESHRE, ACOG এবং NICE-এর আন্তর্জাতিক নির্দেশিকার ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী হালনাগাদ করা হয়।

Content prepared by: Doctors24 Editorial Team

Medical information is verified using registered doctor data and trusted healthcare sources

Information sources: Public records, hospital data, and provided credentials

Published At: July 29, 2026

Last updated: July 29, 2026 Read Editorial Policy →

Related Infertility Specialist Articles

View all →